30 C
Dhaka
Wednesday, August 17, 2022
Home Fiber To Fabric ডেনিম ওয়াশিং এর ক্ষেত্রে পানির ব্যাবহার কমানো ও লেজার ওয়াশিং টেকনিক

ডেনিম ওয়াশিং এর ক্ষেত্রে পানির ব্যাবহার কমানো ও লেজার ওয়াশিং টেকনিক

পৃথিবী পৃষ্ঠের পানির শতকরা ৯৬ ভাগই লবণাক্ত পানি। প্রচুর পানি থাকা সত্ত্বেও সবক্ষেত্রে এ পানি ব্যাবহার করা যায় না। কোনো কিছু ধোয়ার পাশাপাশি খাবারের ক্ষেত্রে এবং খাদ্য উৎপাদন এর ক্ষেত্রে পানি ব্যাবহার করা হয়। তাছাড়াও পানির নানাবিধ ব্যাবহার রয়েছে। তেমনি, টেক্সটাইল ওয়াশিং এর ক্ষেত্রেও পানি ব্যাপকভাবে ব্যাবহার হয়। টেক্সটাইল ওয়াশিং হলো এমন এক প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে পোশাকের বাহ্যিক ডিজাইনকে মোডিফাই করা, এবং পোশাককে আরো ফ্যাশন সম্বলিত করা হয়। টেক্সটাইল ওয়াশিং এর ড্রাই এবং ওয়েট প্রসেস পদ্ধতির ক্ষেত্রে অগণিত ভিন্নতা রয়েছে।

বর্তমান বিশ্বে পানি দূষন এবং পরিবেশের সমস্যাগুলো ক্রমেই বেড়ে চলেছে। তাই ডেনিম ওয়াশিং এর ক্ষেত্রে পানির প্রচুর মাত্রায় ব্যাবহারকে পরিবেশবান্ধব হিসেবে বিবেচনা করা হয়না।

ওয়াশিং প্ল্যান্টগুলোতে পানির ব্যাবহার পরিবেশের উপর মারাত্নক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে কারন এই পানি বিভিন্ন ক্ষতিকারক রাসায়নিক পদার্থ দ্বারা দূষিত থাকে। তাই বিভিন্ন কোম্পানি এবং প্রস্তুতকারকরা ওয়াশিং সেক্টরে পানির ব্যাবহার কমানোর উপর জোর দিচ্ছে। বর্তমান সময়ে পানির ব্যাবহার কমানোর বিভিন্ন ধরনের আধুনিক পদ্ধতি রয়েছে। যার মধ্যে ই-ফ্লো ন্যানোবাবল টেকনোলজি, UP টেকনোলজি, CORE টেকনোলজি, ওজোন ফেডিং টেকনোলজি, লেজার টেকনোলজি ইত্যাদি অন্যতম। তাছাড়া জিয়ানুলজিয়া নামক কোম্পানি “ One Glass, One Garment” নামক এক টেকনোলজি এনেছে। এর মাধ্যমে এক গ্লাস পানি দ্বারা একটি কাপড়ে কাঙ্খিত ওয়াশ ইফেক্ট আনা যাবে।

লেজার মেকানিজিমঃ

লেজার সিস্টেম একটি স্বল্পবিস্তীর্ন বীমে একরঙা আলোক কণা উৎপন্ন করে। ফোকাস করা জায়গাতে অত্যাধিক তাপ উৎপন্ন করে। তারপর এই অংশটুকু তাপ শোষনের মাত্রা অনুযায়ী কঠিন থেকে তরলে গলতে শুরু করে। তরল অংশটুকু তরলের সারফেস টেনশনের কারনে অল্প মুভ করে। তরল অংশ খুব তাড়াতাড়ি গলতে গলতে গ্যাসে পরিণত হয়। প্রক্রিয়াটি খুবই দ্রুততর, এবং এর ইফেক্টগুলো দেখতে অসাধারন। এ প্রক্রিয়াটি নিন্মে চিত্রের মাধ্যমে দেখানো হলো।

লেজার ওয়াশিং টেকনোলজি ও এর ব্যাবহারঃ

লেজার ওয়াশ এমন এক ধরনের ভিন্নধর্মী প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে ডেনিম গার্মেন্টস এর উপর অসাধারন ওয়াশ ইফেক্ট আনা যায়, যা পরিবেশের জন্যও ক্ষতিকারক নয়। লেজার ওয়াশ এর ক্ষেত্রে কোনো পানি, পাথর বা অন্যান্য ক্যামিকেল ব্যাবহার করা হয়না।

গার্মেন্টস সেক্টরে CO2 লেজার ট্রিট্মেন্ট অধিক ব্যাবহার হচ্ছে। কারন ডেনিম ব্রান্ডগুলো এখন অন্যান্য ওয়াশ প্রসেস এর পরিবর্তে লেজার ওয়াশ এর দিকে ঝুঁকছে। বিশ্ব ডেনিম মার্কেটে এই লেজার ওয়াশ প্রযুক্তিটি খুবই গ্রহনযোগ্যতা পেয়েছে। এ টেকনোলজিতে প্রথমে কম্পিউটারের সাহায্যে কাঙ্খিত ইফেক্ট এর ডিজাইন করা হয়। পরে তা কম্পিউটার থেকে লেজার মেশিনে স্থানান্তর করা হয়। গার্মেন্টস কাটিং বেড এ রাখা হয় এবং আলোর প্রবলতা অনুযায়ী ফোকাস করা জায়গাতে লেজার রশ্নি পড়ে। তারপর এর মাধ্যমে কাপড়ের সারফেস এ ইফেক্ট আসে। যেহেতু এটি কম্পিউটারের সিস্টেমের সাহায্যে পরিচালিত তাই লেজার প্রক্রিয়ায় গার্মেন্টস এর সারফেসে ডট, লাইন, যেকোনো লিখা, এমনকি ছবিও আকা যায়। বর্তমানে গার্মেন্টস ইন্ড্রাস্ট্রি বিভিন্ন ধরনের লেজার ওয়াশিং টেকনিক বিদ্যমান রয়েছে। লেজারের কিছু জনপ্রিয় ব্যাবহার হলো লেজার মার্কিং, লেজার এনগ্রেভিং( খোদাই করা), লেজার ওয়েল্ডিং( দুই বা ততোধিক কাপড়ের স্তর যোগ করা), লেজার কাটিং, ইত্যাদি।

এ পদ্ধতিটি জনপ্রিয়তা পাওয়ার কারন হলো এটি পরিবেশবান্ধব এবং বেশ লাভজনক। লেজার ওয়াশিং টেকনিক এর মাধ্যমে শুধু ইফেক্টের ভিন্নতাই নয়, পাশাপাশি এর সাহায্যে অপারেটররা তাদের ডিজাইন বা ইফেক্টের ক্রিয়েটিভিটি দেখাতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অন্যান্য ওয়াশ টেকনিকের তুলনায় লেজার ওয়াশিং এর উৎপাদন ক্ষমতা অনেক বেশী। এটি সমপরিমান জায়গায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে অন্যান্য ওয়াশ এর চেয়ে ৫০০% বেশী উৎপাদন করতে সক্ষম। এ টেকনোলজি প্রায় ৬২% এনার্জি, ৬৭% পানি, ৮৫% ক্যামিকেল সাশ্রয়ী। তাছাড়া জিন্স ফিনিশিং এর ক্ষেত্রে এটি ৫৫% সময় সাশ্রয়ী।

লেজার টেকনোলজির সাহায্যে প্রতি ঘন্টায় ১০০-২০০ ইউনিট উৎপাদন সম্ভব। ম্যানুয়াল স্ক্র্যাপিং ( শিরিষ কাগজের সাহায্যে হাত দিয়ে ঘষে ইফেক্ট আনার পদ্ধতি) এর মাধ্যমে ঘন্টায় মাত্র ১০-১২ ইউনিট এবং স্প্রে পেইন্টিং এর মাধ্যমে ঘন্টায় ৬০ ইউনিট উৎপাদন সম্ভব। এ থেকে বুঝা যাচ্ছে লেজার টেকনিক কতোটা সময় বাচিয়ে দিচ্ছে। তাই, লেজার পদ্ধতিতে কাপড় প্রস্তুতকারকরা বেশী লাভবান হচ্ছে।

লেজার টেকনোলজি ব্যাবহারের সুবিধাঃ

  • এতে কোনো পানি এবং ক্যামিক্যালের  প্রয়োজন হয়না। এর ব্যাবহারের ফলে ওয়াশিং সেক্টরে পানি এবং ক্যামিকেলের অত্যাধিক ব্যাবহার রোধ করা সম্ভব। বর্তমান বিশ্বে ক্রমবর্ধমান পরিবেশ দূষন রোধে এ পদ্ধতিটি ভালো ভূমিকা রাখছে।
  • এটি পরিবেশবান্ধব এবং আর্থিকভাবে অধিক লাভজনক।.
  • এটি একটি মেকানিক্যাল প্রসেস। এটি স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি। এজন্য এতে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা কম।
  • লেজার মেশিন সিম্পল এবং আকারে ছোট। এটি অল্প পরিসরের জায়গাতেই স্থাপন সম্ভব।
  • অন্যান্য ড্রাই ওয়াশিং পদ্ধতি  থেকে এর উৎপাদন ক্ষমতা বেশি।
  • লেজার ওয়াশিং এর ক্ষেত্রে ফ্যাব্রিকের স্ট্রেন্থ কম ক্ষতি হয়।
  • অন্যান্য ওয়াশিং পদ্ধতির চেয়ে এ পদ্ধতিতে শ্রমিক সংখ্যা প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ প্রয়োজন হয়।

লেজার টেকনোলজির অসুবিধাঃ

  • লেজার রশ্নি স্বাস্থ্যর জন্য ক্ষতিকারক। এর কারনে চর্ম ক্যান্সার ও হতে পারে। তাছাড়া লেজার রশ্নি গার্মেন্টস এর উপরিভাগে আপতিত হয়ে যে ধোয়ার তৈরি করে তাও ক্ষতিকারক।
  • সবসময় লেজারের ব্যাবহারের মাধ্যমে গার্মেন্টসে পুরোপুরি ন্যাচারাল ইফেক্ট আনা সম্ভব হয়না।
  • ইফেক্টকে প্রায় সময়ই আর্টিফিসিয়াল মনে হয়।
  • লেজার মেশিনের রক্ষনাবেক্ষন কোনো কোনো মূহুর্তে সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।
  • দক্ষ অপারেটর ছাড়া এটা পরিচালনা করা ঝুকিপূর্ন।
  • প্রাথমিকভাবে এটি স্থাপনের জন্য ব্যয় তুলনামূলক বেশি। যা ছোট ও মাঝারি ফ্যাক্টরিগুলোর জন্য দুঃসাধ্য।
  • লেজার সিস্টেমে তুলনামূলক বেশী বিদ্যুৎ এর খরচ হয়।

আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এ টেকনোলজির ভালো মন্দ দুটো দিকই রয়েছে। লেজার ওয়াশিং টেকনোলজি ব্যাবহারের মাধ্যমে ওয়াশিং ফ্যাক্টরীগুলোতে শ্রমিক সখ্যা কমে যাবে। কর্মসংস্থান এর ক্ষেত্রে এটা একটা সমস্যার কারন হয়ে দাড়াতে পারে। তবে টেক্সটাইল সেক্টরে অন্যান্য প্রতিযোগী দেশগুলো যেভাবে এমন উন্নত প্রযুক্তি ব্যাবহারের ফলে এগিয়ে যাচ্ছে তাতে আমাদের আর হাত গুটিয়ে বসে থাকার সুযোগ নেই। আমাদের দেশে ইতিমধ্যে লেজার ওয়াশিং টেকনোলজির ব্যাবহার শুরু হয়েছে। বেশ কিছু ওয়াশিং প্ল্যান্টে এখন এ লেজার ওয়াশিং টেকনোলজি ব্যাবহার হচ্ছে। লেজার প্রযুক্তিটি পরিবেশবান্ধব এবং এর দ্বারা ডেনিম কাপড়ে ভিন্ন রকমের ক্রিয়েটিভ ইফেক্ট দেয়া যায় বিধায় এর চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে। টেক্সটাইল বিশ্বে যেভাবে লেজার ওয়াশিং টেকনোলজি এর জনপ্রিয়তা ও ব্যাবহার বেড়েছে, আমাদের দেশেও নিকট ভবিষ্যতে ওয়াশিং ইন্ড্রাষ্টিগুলোতে এর ব্যাবহার বাড়তে থাকবে তা সহজেই অনুমেয়।

Writer:
Fahmid Al Refat
PAU
Sr. Research Assistant, Bunon

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

টেক্সটাইল ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পে “টেকসই উন্নয়ন” শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত

৩ জুলাই বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অফ ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি এর টিইএম (টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট) বিভাগ এর সহযোগিতায় টেক্সটাইল ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্ডাস্ট্রিতে টেকসই উন্নয়ন...

বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি’র টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার্থীদের অভিনব উদ্যোগ

বাংলাদেশের টেক্সটাইল ও ফ্যাশন নির্ভর অন্যতম প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অফ ফ্যাশন এন্ড টেকনোলজি জন্মলগ্ন থেকেই উন্নত ও মানসম্পন্ন শিক্ষা ছড়িয়ে দেয়ার...

সিটেক ক্যারিয়ার ক্লাবের উদ্যোগে মার্চেন্ডাইজিং বিষয়ক ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠিত

গত ৫ ও ৬ জুলাই ২০২২ রাত ৯:৩০-১১:০০ টায় সিটেক ক্যারিয়ার ক্লাবের উদ‍্যোগে “Basic knowledge on Merchandising” শীর্ষক ভার্চুয়াল ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠিত হয়।...

বিভিন্ন প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে সিটেকে বার্ষিক ইসলামিক কনফারেন্স অনুষ্ঠিত

গত ২৪ জুন ২০২২ এ টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, জোরারগঞ্জ, চট্টগ্রাম এর মুসলিম শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে কলেজ অডিটোরিয়ামে "সিটেক বার্ষিক ইসলামিক কনফারেন্স ২০২২" শীর্ষক...

ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ ডিবেটিং ক্লাব এর উদ্যোগে অনলাইন বিতর্ক মঞ্চ আয়োজিত | WUBDC organised a online debating session.

বিতার্কিকরাই জীবনের জটিল সময় গুলোতে যুক্তি দিয়ে মুক্তি খুঁজে আনেন।যারা বিতর্ক নিয়ে চর্চা করেন বা বিতর্কের গহীন জলে নিজেকে ডুবিয়ে দেন...

কর্পোরেট গ্রোমিং

মার্চেন্ডাইজিং ও মার্কেটিং এ চাকরী করেন অথবা চাকরীতে ঢুকতে যাচ্ছেন তাদের জন্য আমি গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পয়েন্ট উল্লেখ্য করেছি। এই পয়েন্টগুলো অনুসরণ...

বাংলাদেশের পাটের ইতিহাস | History of Bangladeshi Jute

মৌসুমী বায়ু প্রবাহিত হওয়ায় উষ্ণ ও আদ্র জলবায়ুর এবং মাটির কারনে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ পাট এ অঞ্চলেই জন্মে। সেই সুবাদেই ১৯৫১ খ্রীস্টাব্দে...