27 C
Dhaka
Thursday, December 9, 2021
Home News & Analysis পোশাক শিল্পে নারী শ্রমিক: নবজাগরণের সূচনায় রিয়াজ গার্মেন্টস (পর্ব-০১)

পোশাক শিল্পে নারী শ্রমিক: নবজাগরণের সূচনায় রিয়াজ গার্মেন্টস (পর্ব-০১)

আমাদের জনসংখ্যার অধিকাংশ নারী হলেও উন্নয়নের সব সূচকে নারীর অংশ গ্রহণ সমান নয়। কিন্তু পোশাক শিল্প কারখানায় ইতিবাচক এবং নেতিবাচক সব কিছুর বিরুদ্ধে লড়াই করে নারীরা আজ এই খাতকে শুধু বাঁচিয়ে রাখেনি উত্তরোত্তর সমৃদ্ধির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তারাই আমাদের পোশাক শিল্পের চালিকা শক্তি হয়ে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে শিল্পভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরিত করেছে। শিল্পায়নের মাধ্যমেই অর্থনীতির অপরাপর খাত, উপখাতের বিকাশে সুযোগ সৃষ্টি হয়। ফলে দেশের অগ্রগতি তরান্বিত হয়। দরিদ্র পরিবারের অনেক মেয়েই আগে বাড়ি বাড়ি ঝিয়ের কাজ করতো কিংবা দারিদ্র্য মেনে নিয়ে স্বামী বা বাবার আয়ের ওপর নির্ভর করে মানবেতর জীবন–যাপন করতো। কিন্তু পোশাক শিল্প কারখানাগুলো নারীকে কাজের সুযোগ করে দিয়েছে। ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। গ্রাম থেকে এসে যে সব নারী পোশাক শিল্পে কাজ করে তারা প্রতিমাসে গ্রামের বাড়িতে টাকা পাঠায়। তাদের এই টাকার উপরে পারিবারিক একটা নির্ভরশীলতা তৈরি হয়। গ্রামের এই সহজ সরল লাজুক মেয়েদের আয়ে হয়ত ভাই বোনের লেখা–পড়ার খরচ চলে। কিংবা তার বেতনের টাকা দিয়েই পরিবারের কেউ ছোট–খাট একটা ব্যবসা করে দারিদ্র্য ঘুচাতে সক্ষম হয়। এইভাবেই গ্রামীণ অর্থনীতিতে একটা ইতিবাচক প্রভাব রাখছে পোশাক শিল্পের নারী।

অর্থনীতিতে নারীর অবদান নারীকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্র তৈরি করেছে এবং তার স্বাধীনতা বাড়িয়ে দিয়েছে। হয়েছে নারীর ক্ষমতায়ন শ্রমজীবী নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন পরিবারে তাদের অবস্থানের পরিবর্তন সাধন করেছেন। আর্থিক সক্ষমতা অর্জনের কারণে এইসব নারী শ্রমিকদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে। চাকরির সুবিধা ভোগকারি বাবা, ভাই এবং স্বামীর ঐতিহ্যগত পিতৃতান্ত্রিক কর্তৃত্বের ক্ষেত্রে পরিবর্তন সাধন করেছে। গ্রামীণ নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের কোনো স্বাধীনতা নেই। কিন্তু যে সব মেয়ে বা মহিলা শহরে এসে পোশাক শিল্পে কাজ করছে তারা নিজের জীবনের ক্ষেত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সে নিজে নিচ্ছে। তাছাড়া পারিবারিক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণেও ভূমিকা রাখছে তারা। সমাজে বাল্য বিবাহের সংখ্যা কমেছে। সেই সাথে জন্মহারও হ্রাস পেয়েছে। শ্রমজীবী নারীরা ভাই–বোন কিংবা ছেলে–মেয়েদের স্কুলে পাঠাচ্ছে। ফলে শিক্ষার হার বাড়ছে। অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বিতা অর্জনের ফলেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নারীর এই স্বাধীনতা এসেছে এবং তা সম্ভব করেছে পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠান। কেননা দেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস তৈরি পোশাক শিল্পে অধিকাংশ শ্রমিক নারী নিয়োগ করার মাধ্যমে তাদের স্বাবলম্বী হওয়ার পথ সৃষ্টি করে দিচ্ছে।

বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ তৈরি পোশাক খাত হতে অর্জিত হয়।  ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এ খাতে মোট রপ্তানি আয় হয়েছে ৩৪.১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার যা বিগত অর্থবছরের তুলনায় ১১.৪৯% বেশি। তন্মধ্যে ওভেন গার্মেন্টস থেকে রপ্তানি আয় হয়েছে ১৭.২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার যা বিগত অর্থবছরের রপ্তানি আয়ের তুলনায় ১১.৭৯% বেশি এবং নীট গার্মেন্টস থেকে আয় হয়েছে ১৬.৮৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার যা বিগত অর্থ বছরের রপ্তানি আয়ের ১১.১৯% বেশি। বর্তমানে এ খাতে প্রায় ৪.৫ মিলিয়ন শ্রমিক কর্মরত আছে তন্মধ্যে নারী শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৬০ শতাংশ। নারীর ক্ষমতায়নে এ খাত গুরত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখছে। এই বিষয়টি এদেশের জন্য গর্ব করার মতো বিষয়। নারীদের এ ক্ষমতায়ন রাতারাতি হয়ে যায়নি এর পিছনেও রয়েছে ইতিহাস। আজকে আমরা সে অজানা ইতিহাস সম্পর্কে জেনে নিব।

আমরা যদি এই বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ইতিহাস দেখি তাহলে ফিরে যেতে হবে ১৯৭৪ সালে। তখনকার সমাজের নারীরা শুধুমাত্র গৃহস্থালির কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো। তখন জনাব রিয়াজউদ্দিন সাহেবের (রিয়াজ গার্মেন্টস এর মালিক। যিনি দেশের প্রথম এক্সপোর্ট ওরিয়েন্টেড গার্মেন্টসের প্রতিষ্ঠাতা) সাহসী উদ্দ্যোগের কারনেই নারীদেরকে পোষাক শিল্পে আনা সম্ভব হয়েছিলো। জনাব রিয়াজউদ্দিন তার স্বপ্নদর্শী নেতৃত্বের মাধ্যমে তৈরী পোষাক শিল্পে নারী শ্রমশক্তিকে যথাযথ ভাবে কাজে লাগানোর জন্য গভীর ভাবে আশাবাদী ছিলেন।

১৯৬০-১৯৭৪ সালের প্রাক কালে তৈরী পোষাক শিল্পে প্রায় ৯৮% পুরুষ শ্রমিক কাজ করতো। জনাব রিয়াজউদ্দিন সাহেব প্রতিটি পরিবারের দুয়ারে দুয়ারে গিয়েছেন শুধু মাত্র নারী শ্রম শক্তিকে কাজে লাগিয়ে, তাদের পরিবারকে আর্থিক ভাবে সহযোগীতা করার উদ্দেশ্যে। যেহুতু এটা ছিলো কঠিন প্রত্যয় যেখানে পরিবারের মেয়ে, বোন, বউদেরকে পরিবারের বাহিরে গিয়ে কাজ করতে হবে যা নারীদেরকে তাদের ভবিষ্যত জীবনে বাধার সম্মুখীন করতে পারে তাই বেশির ভাগ পরিবার তার উদ্যোগকে সম্মতি দেয়নি।

১৯৭৭ সাল, জনাব রিয়াজউদ্দিন সাহেব অতন্ত যুকিপূর্ণ এবং সাহসী একটি উদ্দোগ নেন যে, তার কন্যা জনাবা ফাতেমা বেগম মুক্তা কে তিনি তার নিজস্ব ফ্যাক্টরিতে কাজে নিযুক্ত করেন শুধু মাত্র নারীদের কে এই শিল্পে এগিয়ে নিয়ে আসার সাহস জোগানোর জন্য। জনাবা ফাতেমা বেগম বাংলাদেশের পোষাক শিল্পের সর্ব প্রথম নারী শ্রমিকের স্বীকৃতি পান। জনাব রিয়াজউদ্দিন সাহেবের এই সাহসী উদ্দোগের মাধ্যমে তিনি নারীদের পোষাক শিল্পে আসার সাহস যুগিয়ে পরিপূর্ণ ভাবে সফল হয়েছেন এবং জনাবা হেলেনা, জনাবা পপি, জনাবা কাওসার নারীদের মধ্যে অন্যতম।

Writer:
Saikat Hossain Shohel

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

” জাতীয় বস্ত্র দিবসে টেক্সটাইল বিষয়ক কুইজের আয়োজন করেছে সিটেক ক্যারিয়ার ক্লাব”

৪ ডিসেম্বর জাতীয় বস্ত্র দিবস ২০২১ উপলক্ষে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, জোরারগন্জ,চট্টগ্রাম (সিটেক) এর ক্যারিয়ার বিষয়ক ক্লাব "সিটেক ক্যারিয়ার ক্লাব" কর্তৃক সকল...

লিখিত অনুমোদন পেয়েছে সিটেক ক্যারিয়ার ক্লাবের নতুন কমিটি

টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, জোরারগন্জ, চট্টগ্রাম এর ক্যারিয়ার বিষয়ক ক্লাব " সিটেক ক্যারিয়ার ক্লাব" এর ২০২১-২২ সেশানের গঠিত নতুন কমিটিকে লিখিত অনুমোদন...

চট্টগ্রাম টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে সপ্তাহব্যাপী অল ওভার প্রিন্টিং ওয়েবিনার সম্পন্ন : মূল্যায়ন পরীক্ষা ১৪ নভেম্বর

অল ওভার প্রিন্টিং (All Over Printing) এবং ডিজাইন ডেভেলপমেন্ট (Design Development) এর ওপর চট্টগ্রাম টেক্সটাইল ইন্জিনিয়ারিং কলেজে (সিটেক) AOPTB (All Over...

অধ্যক্ষের সাথে সিটেক ক্যারিয়ার ক্লাবের নবগঠিত কমিটির সৌজন্য সাক্ষাত

চট্টগ্রাম টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ (সিটেক) এর ক্যারিয়ার বিষয়ক সংগঠন সিটেক ক্যারিয়ার ক্লাবের ২০২১-২০২২ সেশনের নবগঠিত কমিটির সাথে অত্র কলেজের সম্মানিত অধ্যক্ষ...

সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট কি, কেন, কিভাবে ?

আমরা সকলেই বাস্তুতন্ত্র বা ইকোসিস্টেম শব্দটার সাথে পরিচিত।এই বাস্তুতন্ত্র বা ইকোসিস্টেমে আসলে কি হয়!উৎপাদ থেকে বিয়োজক শ্রেণির মধ্যে খাদ্যের পরিবহন চিত্রটা...

আয়ারল্যান্ডে উচ্চশিক্ষা বিষয়ক সাক্ষাৎকার | Interview on Higher Study in Ireland

বাংলাদেশে টেক্সটাইল শিল্পের ক্রমেই দ্রুত বিকাশ ঘটে চলেছে এবং বিশ্বমানের টেক্সটাইল শিল্পের কাতারে বাংলাদেশের টেক্সটাইল শিল্প ইতোমধ্যেই নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম...

তৈরী পোশাক রপ্তানি দিবস

আমাদের বাংলাদেশ এর প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী সেক্টর টেক্সটাইল এবং গার্মেন্টস সেক্টর। এই সেক্টর হতে প্রায় ৮০% এর বেশি বৈদেশিক মুদ্রা...