29 C
Dhaka
Wednesday, October 28, 2020
Home News & Analysis বস্ত্র শিল্প(RMG Sector) যার উপর দাঁড়িয়ে আমাদের অর্থনীতি।

বস্ত্র শিল্প(RMG Sector) যার উপর দাঁড়িয়ে আমাদের অর্থনীতি।

বর্তমান বিশ্বের জনসংখ্যা প্রায় ৭০০ কোটি। এই ৭০০ কোটি মানুষের ২য় মৌলিক উপাদান বস্ত্র। বস্ত্র ব্যতীত কেউ ভদ্র সমাজ বা সভ্যতায় চলেতে পারেনি আর পারবেও না। চলুন তবে কথা না বাড়িয়ে একটি পরিসংখ্যান দিয়ে আলোচনা শুরু করা যাক। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আমাদের রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ হাজার ৯০০ কোটি ডলার। তবে আনন্দের সংবাদ হচ্ছে, সামগ্রিক পণ্য রপ্তানি ছিল ৪ হাজার ৫৩ কোটি ডলার। এরমধ্যে শুধু পোশাক রপ্তানিই ৩ হাজার ৪১৩ কোটি ডলার। অর্থাৎ বস্ত্র শিল্প আমাদের জন্য কতটা গুরুত্ব বহন করে সেটা আমরা বুঝতেই পারছি। আলোচনাটা আমি কয়েকটি ভাগে ভাগ করব। প্রথম ভাগে থাকবে প্রাগৈতিহাসিক সময়ের বস্ত্র শিল্পের ইতিহাস, দ্বিতীয় ভাগে থাকবে আধুনিক সভ্যতা কবে থেকে বস্ত্রপরিধান শুরু করে, তৃতীয় ভাগে থাকবে আমাদের দেশে বস্ত্র শিল্পের বিস্তার ও বর্তমান অবস্থা।

প্রাগৈতিহাসিক সময়ের বস্ত্র শিল্পের ইতিহাসঃ ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় সেই আদি কাল থেকেই মানুষ বস্ত্র পরিধান করে আসছে। তাঁরা প্রথমে খাদ্যের জন্য শিকার করত। তাদের একটাই কাজ ছিল আর সেটা খাদ্য সংগ্রহ। কিন্তু একটা সময় তাঁরা বস্ত্রের অভাব অনুভব করল। মস্তিষ্কের বিকাশ হওয়ার সাথে সাথে তাঁরা বুঝতে শিখল বস্ত্র খুবই জরুরি। কিন্তু এটা ভেবে পাচ্ছিলনা কিভাবে এই অভাবটা মিটাতে হবে। ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি ইংল্যান্ডের ডেইলি মেইল পত্রিকা একটা রিপোর্ট প্রকাশ করে। রিপোর্টে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ ও গবেষক ডঃ ডেভিড রিড তাঁর দীর্ঘ গবেষণার পর দেখতে পান মানবসভ্যতা প্রায় ১,৭০,০০০ বছর পূর্বে বস্ত্র পরিধান করা শুরু করে। হ্যাঁ বস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা পুরনের জন্য তাঁরা গাছের বাকল,পাতা,পশুর চামড়া ইত্যাদি ব্যবহার করে নিজেদের শরীর ঢাকতে শুরু করে। এভাবেই মানবসভ্যতা প্রথম বস্ত্র সম্পর্কে ধারণা লাভ করে।

আধুনিক সভ্যতার বস্ত্র পরিধানঃ সময় যত বাড়তে থাকে মানব সভ্যতা তত আধুনিক তার দিকে ধাবিত হতে থাকে। জ্ঞানের পরিধি বাড়ার সাথে সাথে তাঁরা এই বস্ত্র কে নতুন নতুন রুপে সাজাতে শুরু করে। ডঃ ডেভিড রিডের মতে, আধুনিক মানব সমাজ প্রায় ৭০,০০০ বছর পূর্বে পোশাক পরিধান করেন। তবে ৫,০০০ বছর পূর্বে বস্ত্র বা টেক্সটাইল শিল্প বিশ্বব্যাপী ব্যপক হারে বিস্তার করতে শুরু করে। এ সময়ে ভারত, মিশর, চিন, মঙ্গোলিয়া, ইউরোপ ইত্যাদি দেশে বস্ত্র শিল্পের চাহিদা বাড়তে থাকে। রোমান সভ্যতা বিস্তারের সাথে সাথে ইউরোপে প্রচুর তুলা, লিলেন, লেদার কাপড়ের চাহিদা বাড়তে থাকে। এ সময় তাঁদের নিকট সব থেকে বেশি জনপ্রিয় ছিল সিল্ক কাপড়। যেটা তাঁরা লাকজারিয়াস লাইফের জন্য ব্যবহার করত। এই কাপড়ের প্রায় সবটুকুই তাঁরা চিন থেকে আমদানি করত। তখন চিন নিয়ন্ত্রণ করত হান রাজারা। যে পথটি ধরে ইউরোপ সিল্ক কাপড় আমদানি করত সেই পথের নাম দেয়া হয়েছিল সিল্ক রোড। যেটা ছিল চিন থেকে সুদূর ইউরোপ পর্যন্ত আর আয়তন ছিল প্রায় ৪০০০ মাইল বা ৬৫০০ কিঃমি। বর্তমানে চিন সরকার এই পথটি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এভাবে বস্ত্র শিল্প শতকের পর শতক পার করতে থাকে।

বস্ত্র শিল্পে শিল্প বিপ্লবের ছোঁয়াঃ ১৭৫০-১৮৫০ খ্রিস্টাব্দ। বিশ্ব ব্যাপী ছোঁয়া লাগে শিল্প বিপ্লবের। এই সময় কালে মানুষ কৃষি এবং বাণিজ্যিক ব্যবস্থা থেকে আধুনিক শিল্পায়নের দিকে ঝুকে পড়ে। পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দীর সমুদ্র যাত্রা বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যের পথ খুলে দেয়। এরপর পুঁজিবাদের উদ্ভব, বাষ্পীয়ইঞ্জিনের আবিষ্কার, কয়লার খনিআর ইস্পাতের ব্যাপক ব্যবহারের ফলে অনেক শিল্প শহর আর কারখানা গড়ে উঠে। এই শিল্প বিপ্লবের ছোঁয়া বস্ত্র বা টেক্সটাইল শিল্পের ও ভিত নাড়িয়ে দেয়। শিল্প বিপ্লবের সময় কালে কিছু বিখ্যাত টেক্সটাইল বিজ্ঞানীদের আগমন ঘটে। যারা এ শিল্পের আমুল পরিবর্তন ঘটে। তাঁদের কথা না বললেই নয়। এদের মধ্যে অন্যতম ব্রিটেনে জন্ম নেয়া স্যার রিচাড। যিনি নিজেও ছিলেন একজন শিল্পপতি। তিনি “পাওয়ার ড্রাইভেন মেশিনারি ও এমপ্লয়মেন্ট অফ এফ্যাকটরিসিস্টেম অফ প্রডাকশন” সম্পর্কে নতুন তথ্য আবিস্কার করেন। যেটা প্রোডাকশন ক্যাপাসিটি বহুগুন বাড়িয়ে দেয়। ব্রিটেনের আরও দুইজন বিখ্যাত বিজ্ঞানি ছিলেন। তাঁরা হলেন জন কি এবং জোসেফ সোয়ান যারা যথাক্রমে ফ্লাইং শাটেললুম এবং সিনথেতিক ফাইবার আবিস্কার করেন। উইলিয়াম লিযিনিনি টেডমেশিন আবিস্কার করেন। ব্রিটেনের উইলিয়ম হেনরি পেককিন যিনি কুইনিন সংশ্লেষন করতে গিয়ে ব্যর্থ হন কিন্তু আবিস্কারক রেফেলেন এনিলিনডাইজ (অনিচ্ছাকৃত ভাবে)। ফ্রান্সের বিখ্যাত বিজ্ঞনি ছিলেন জোসেফ মারিয়ে জ্যাকার্ড। তিনি বস্ত্র শিল্পকে এক নতুন ধাপে নিয়ে যান। ১৮০০ সালের দিকে তিনি জ্যাকার্ড ম্যাশিন আবিস্কার করেন। যেটা সত্যিই ছিল এক যুগান্তকারী আবিষ্কার। ইউরোপে নতুন নতুন উদ্ভাবনী শক্তি ও চাহিদার ফলে সে সময়ে আমাদের ভারত উপমহাদেশ ও এর প্রভাব ব্যপক হারে পরতে থাকে। পুরানো টেক্সটাইল ঐতিহ্যের জন্য এখানে ও নতুন ধরনের কলকারখানা গড়তে শুরু করে।

বাংলাদেশে বস্ত্র শিল্পের ইতিহাসঃ
প্রায় ১৫৫০ সালের দিকে আমাদের ভারত উপমহাদেশ বস্ত্র শিল্পের কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত হয়। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ অধ্যাপক জি উইলিয়াম তাঁর বই “India’s Deindustrialization in the 18th and 19th Centuries” তে উল্লেখ করেছেন, সেই সময়ে সারা বিশ্বের প্রায় ২৫% বস্ত্র ভারত উপমহাদেশ একা প্রদান করত। মোঘল রাজাদের শাসনাধীন ভারত উপমহাদেশ সেই সময় ছিল বস্ত্রের জন্য সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ টেক্সটাইল কারখানা, তুলার কারখানা এই উপমহাদেশে ছিল। বাংলার মসলিন কাপড় সেই সময়ে সারা বিশ্বের মন জয় করতে পেরেছিল। শুধু তাই নয় বাংলার টেক্সটাইল শিল্প ডাচ ব্যবসায়ীদের দ্বারা ইউরোপে প্রায় ৫০ ভাগ টেক্সটাইল পন্য ও ৮০ ভাগ সিল্ক রপ্তানি করা শুরু করে। এশিয়ার প্রায় সকল স্থানে বাংলার টেক্সটাইল পন্য ছড়িয়ে যায় যেটা ঢাকা টেক্সটাইল নামে পরিচিতি লাভ করে। সত্যি বলতে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ জানতনা যে টেক্সটাইল বা বস্ত্র শিল্প কি? কিন্তু আমাদের এই দেশে টেক্সটাইলের ইতিহাস অনেক পুরোনো। বিংশ শতাব্দীতে এই বাংলায় যার হাতে নতুন করে টেক্সটাইলের জন্ম হয়েছিল তিনি ছিলেন কুষ্টিয়ার সূর্যসন্তান মোহিনী মোহন চক্রবর্তী। তিনি কুমার খালীর থানার এ লাঙ্গী পাড়ায় এক অভিজাত ব্রাক্ষ্মণ পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। ভারত উপমহাদেশে টেক্সটাইল শিল্পের ইতিহাসে যে কয়জন বিখ্যাত ব্যক্তির নাম পাওয়া যায় তাঁর মধ্যে তিনি অন্যতম ব্যক্তিত্ব। তিনি স্বদেশী আন্দোলনে ও যোগ দিয়েছিলেন। বাংলাকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে ১৯০৮ সালে কুষ্টিয়া শহরে গড়াই নদীর পাশে মিলপাড়া এলাকায় প্রায় ১০০ একর জমির ওপর একটি টেক্সটাইল মিল চালু করেন। নাম দেন – মোহিনী মোহন মিলস এন্ড কোম্পানী লিমিটেড। তৎকালিন সময়ে কুষ্টিয়ার উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল। নদী পথ এবং ভারতের শিয়ালদাহ হতে কুষ্টিয়া মিলপাড়া পর্যন্ত রেলপথ ছিল। প্রথম বস্থায় ৮ টি তাঁত নিয়ে মিল চালু করেন। পরে তিনি সুদূর ব্রিটেন থেকে ২০০ টি পিতলের হ্যান্ডলুম তাঁত আমদানী করেন। এখানে প্রায় ৩০০০ মানুষ কাজ করত। এখানে উন্নত মানের সুতা, মোটা শাড়ী ও ধুতি তৈরি হত। ধীরে ধীরে মিলটি দেশের বৈদেশীক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম মাধ্যম হতে থাকে। মিলটি থেকে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, বার্মাতে প্রচুর পরিমাণে সূতা রপ্তানী হত। এটি পরবর্তীতে সমগ্র এশিয়ার সর্ববৃহৎ কাপড় মিল হিসেবে এটি স্বীকৃতি পায়। কিন্তু দুঃখের বিষয় আমরা তাকে প্রাপ্য সম্মান দিতে পারি নাই। পাকিস্তান সরকারের কর্তা ব্যক্তিরা ১৯৬৫ সালে মোহিনী মোহন কে হত্যার হুমকি দেয়। বাধ্য হয়ে এই মহান উদ্যোক্তা রাতের আধারে এক কাপড়ে স্ত্রী, সন্তান সহ ভারতে পালিয়ে যান।

বাংলায় টেক্সটাইল শিক্ষার সুচনাঃ আমরা কেবল জেনারেল বিষয়গুলো নিয়েই এতই ব্যস্ত যে টেক্সটাইল অথবা বস্ত্র শিল্পের উপর যে পড়াশুনা আছে সেটা খুব কম মানুষই জানি। কিন্তু সত্যি বলতে আমাদের দেশে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং এর ইতিহাস অনেক পুরোনো। এর প্রথম যাত্রা শুরু হয় ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দে। ব্রিটিশ আমলে এই দেশে প্রথম ৩৩ টি উইভিং স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই স্কুল গুলো করা হয়েছিল বাংলার চলমান বস্ত্র শিল্পে কিছু সংখ্যক টেকনিশিয়ান নিয়োগ দানের উদ্দ্যেশ্যে। সেই সময়ে এই স্কুল গুলোতে মাত্র ছয় মাসের একটি আর্টিসান লেভেল কোর্স করানো হতো। এই ৩৩ টি স্কুল বর্তমান বাংলাদেশের ঢাকাসহ প্রায় ৩৩ টি লোকেশনে গড়ে উঠেছিল। ছাত্র ততটা ছিলোনা বলা চলে। তবু আস্তে আস্তে চলছিলো এই প্রতিষ্ঠান গুলো। সাথে সাথে বেড়ে চলছিল টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং এ দক্ষ জনশক্তি। ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে সেই একই আইনে ব্রিটিশ সরকার নতুন আরেকটি উইভিং স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন ঢাকার নারিন্দায়। ১৯৩০ এরপর ৩৩ টি স্কুলের কিছু কিছু আপগ্রেড করে এক বছরের কোর্সে উন্নীত করা হয়। ১৯৫০ সালে নারিন্দার সেই উইভিং স্কুলকে পুর্ব পাকিস্তান টেক্সটাইল ইনষ্টিটিউট নাম দিয়ে ডিপ্লোমা কোর্সে উন্নীত করা হয়। ১৯৬০ সালে এই প্রতিষ্ঠানকে বর্তমান ক্যাম্পাস তেজগাঁও শিল্প এলাকায় স্থানান্তরিত করা হয়। ১৯৭৮ সালে এই প্রতিষ্ঠান কে ডিগ্রী বা স্নাতক পর্যায়ে উন্নীত করা হয়। তখন এর নাম দেয়া হয় কলেজ অব টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনোলজি। এটিই ২০১০ সালে বাংলাদেশের প্রথম টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। বর্তমানে বাংলাদেশে বেসরকারী প্রায় তেরটিরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয় আছে যেখান থেকে প্রতিনিয়ত টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছেন অনেক শিক্ষার্থী।

বাংলাদেশ থেকে পোশাক রপ্তানির সুচনাঃ বাংলাদেশে প্রথম গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি স্থাপিত হয় ১৯৬০ সালে ঢাকার উর্দু রোডে যার নাম রিয়াজ গার্মেন্টস। এটির প্রথম নাম ছিল রিয়াজ স্টোর যেটি টেইলারিং আউটফিট হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল। ১৯৭৩ সালে রিয়াজ গার্মেন্টস নাম করণ করা হয়। প্রাথমিক ভাবে রিয়াজ গার্মেন্টস এর উৎপাদিত পোশাক স্থানীয় বাজারে বিক্রয় করা হতো। ইংরেজি ১৯৬৭ সালে রিয়াজ গার্মেন্টস এর উৎপাদিত ১০,০০০ পিস শার্ট বাংলাদেশ হতে সর্বপ্রথম বিদেশে রপ্তানি করা হয়। স্বাধীন বাংলাদেশ থেকে প্রথম দেশের বাইরে পোশাক রপ্তানী করে রিয়াজ গার্মেন্টস। ১৯৭৮ সালের ২৯ জুলাই পোশাক রপ্তানী করে দেশে এক হুলস্থুল ব্যাপার ঘটিয়ে ফেলেছিল । ১৯৭৩/৭৪ সালে রিয়াজ গার্মেন্টস মেয়েদের জন্য তিনটি ফ্যাশন উদ্ভাবিত করে। শকুন্তলা, আম্রপালি এবং প্যান্ডোরা। প্রতিটি ছিল বক্ষবন্ধনী । সুতরাং রিয়াজ গার্মেন্টস ছিল বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের অগ্রপথিক।

বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের বর্তমান প্রেক্ষাপটঃ রিয়াজ গার্মেন্টসের হাত ধরে চলা এই পোশাক রপ্তানি আজ অনেক দূর এগিয়েছে। প্রথমেই শুরু করা যাক কিছু তথ্য দিয়ে। বিটিএম এর রিপোর্ট অনুসারে আমাদের দেশের মোট জিডিপির ১৩% -ও বেশি এই খাত থেকে আসে। মোট রপ্তানির ৮৬% আসে টেক্সটাইল খাত থেকে। প্রায় ৪০ লক্ষ্য শ্রমিক এই খাতে জীবিকা নিরবাহ করে যাদের মধ্যে প্রায় ৬৩% হচ্ছেন নারী। ১৯৮১-৮২ সালে বাংলাদেশ ০.১ বিলিয়ন টাকার রেডিমেইড গার্মেন্টস রপ্তানি করে বিশ্ব বাজারে একটি শক্ত পারাখা শুরু করে। এর মাত্র ১০ বছর পর সেটি ১৯৯২-৯৩ সালে ১৪৪৫ মিলিয়ন ইউ.এস ডলারে উন্নীত হয়। গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে পোশাক রপ্তানিতে আয় হয়েছিল ৩ হাজার ৬১ কোটি ডলার। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এর পরিমান দাঁড়ায় ৩ হাজার ৪১৩ কোটি ডলার। এই আয় আগের অর্থবছরের চেয়ে ১১ দশমিক ৪৯ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে সামগ্রিক দিক বিবেচনা করলে পোশাক রপ্তানি বাড়ছে। ইউরোপে আমরা সব থেকে বেশি পোশাক রপ্তানি করি। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) দেশগুলো সারা বছর যে পরিমাণ টি-শার্ট বা গেঞ্জি কেনে, তার প্রায় ৪১ শতাংশই বাংলাদেশি পোশাক কারখানা সরবরাহ করে। ফলে ছয় বছর ধরে ইইউতে টি-শার্ট রপ্তানিতে শীর্ষ অবস্থানে আছে বাংলাদেশ।একই ভাবে যুক্তরাষ্ট্রে ডেনিম রপ্তানিতে বাংলাদেশ শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে। নব্বইয়ের দশক থেকে তৈরি পোশাক রপ্তানি করে আসছে বাংলাদেশ। ইতিমধ্যে সারা বিশ্বে পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। শুরু থেকেই টি-শার্ট রপ্তানি করে এলেও ২৫ বছর পর ২০১১ সালে ইইউতে শীর্ষে পৌঁছে বাংলাদেশ। তার আগ পর্যন্ত তুরস্কই সর্বোচ্চ পরিমাণ টি-শার্ট রপ্তানি করত ইউরোপের বাজারে। ইইউভুক্ত দেশগুলো ২০১৬ সালে ৭৪০ কোটি ইউরো বা ৭০ হাজার ৩০০ কোটি টাকার টি-শার্ট কিনেছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ ৪০ দশমিক ৮১ শতাংশ রপ্তানি করেছে। তুরস্ক ২৬ শতাংশ বা ১৯৬ কোটি ইউরো ও চীন ১৬ শতাংশ বা ১১৭ কোটি ইউরোর টি-শার্ট বা গেঞ্জি রপ্তানি করেছে।

কিছু বাঁধা-বিপত্তি এবং সমাধানঃ ২০১২-১৩ ছিল দেশের পোশাক শিল্পের জন্য এক বড় ধাক্কা। ২০১২ সালের ২০ নভেম্বর আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর এলাকায় অবস্থিত তাজরীন ফ্যাশনস লিমিটেড কারখানায় মারাত্মক অগ্নিকাণ্ড ঘটে। যাতে মোট ১১৭ জন পোষাক শ্রমিক নিহত হয়। ভয়ানক এই দুর্ঘটনায় ঐ পোশাক কারখানার নয় তলা ভবনের ছয় তলা ভস্মীভূত হয়ে যায়। সরাসরি আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা যায় ১০১ জন পোষাক শ্রমিক। আগুন থেকে রেহাই পেতে ও পর থেকে লাফিয়ে পড়ে মৃত্যু হয় আর ও ১০ জনের। ঠিক তার এক বছর যেতে না যেতেই ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সকাল ৮:৪৫ এ সাভার বাসস্ট্যান্ডের পাশে রানা প্লাজা নামের একটি বহুতল ভবন ধসে পড়ে। ভবনের কয়েকটি তলা নিচে দেবে যায়। কিছু অংশ পাশের একটি ভবনের ও পর পড়ে। এ দূর্ঘটনায় এক হাজার ১৭৫ জন শ্রমিক নিহত এবং দুই হাজারের ও বেশি মানুষ আহত হয় যা বিশ্বের ইতিহাসে ৩য় বৃহত্তম শিল্পদুর্ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এরপরই নড়ে-চড়ে বসে বিদেশি ক্রেতারা। তারা শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে সরকারের ওপর চাপ দিতে থাকেন। বিদেশি ক্রেতাদের দ্বারা গঠিত দুটি জোট Alliance এবং Accord শ্রমিকদের কল্যানে কাজ শুরু করে। ২০১৮সালে সমষ্টিগতভাবে তাদের দেয়া বার্ষিক রিপোর্ট অনুসারে কারখানা গুলোর ৮৫ শতাংশ ত্রুটি সংস্কার কাজ শেষ এবং শ্রমিকদের মজুরী একটি সহনীয় কাঠামোর মধ্যে এসেছে। অধিকাংশ শ্রমিক নিজেদের জীবনমান ও নিরাপত্তায় সন্তুষ্ট। এছাড়া ২০১৮ সালে এলায়েন্স তাদের কার্যক্রম শেষ করে এবং তাদের সর্বশেষ রিপোর্ট অনুসারে প্রায় ৯১% কারখানা সঠিকভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে। সুতরাং আমরা দেখতে পাচ্ছি পোশাক শিল্পে আজ অস্বস্তি অনেক কমে গেছে এবং সরকার শ্রমিকদের কল্যানে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।

টেক্সটাইল নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাঃ আমরা হয়তবা অনেকে জানিনা, বিশ্বের শীর্ষ ১০ টি পরিবেশ বান্ধব তৈরি পোশাক পণ্য উৎপাদনকারী কারখানা সমূহের মধ্যে ৭ টিই বাংলাদেশে স্থাপিত। যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনবিল্ডিং কাউন্সিলে নিবন্ধিত ১৯৫ টি বাংলাদেশি সবুজ পোশাক কারখানার মধ্যে ৩৬ টি লিড সনদ পায়। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ইউএসজিবিসিতে নিবন্ধিত আর ও ১৫৯ টি বাংলাদেশি সবুজ পোশাক কারখানা লিডারশিপ ইন এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ড ডিজাইন সনদ পাওয়ার অপেক্ষায় আছে। আর যে ৩৬ টি কারখানা এই সনদ পেয়েছে, তার মধ্যে ৯৭ পয়েন্ট পেয়ে বিশ্বের নাম্বার ওয়ান পোশাক কারখানার স্বীকৃতি অর্জন করেছে রেমিহোল্ডিংস লিমিটেড। ৯২ পয়েন্ট পেয়ে প্লামি ফ্যাশন লিমিটেড দ্বিতীয়, ৯০ পয়েন্ট পেয়ে ভিনট্যাগ ডেনিম স্টুডিও লিমিটেড চতুর্থ, ৮৫ পয়েন্ট পেলে এসকিউ সেলসিস-২ সপ্তম এবং ৮১ পয়েন্ট পেয়ে জেনেসিস ফ্যাশনস লিমিটেড দশম স্থানের য়েছে। বাংলাদেশ সরকার চেষ্টা করতেছে আস্তে আস্তে সকল কারখানাই পরিবেশ বান্ধব বা গ্রিনফ্যাক্টরিতে পরিণত করা হবে। কিন্তু গ্রিন ফ্যাক্টরি করতে প্রচুর পরিমাণে বিনিয়োগ দরকার। একটি ফ্যাক্টরি করতে ২০০ থেকে ৩০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। এর পাশাপাশি জমি ও লাগে ৩ থেকে ১০ বিঘা। দেশের এ পর্যন্ত যেসব কারখানা গ্রিন ফ্যাক্টরির খেতাব জিতে নিয়েছে তাদের বেশিরভাগ উদ্যোক্তার বিনিয়োগই ছিল ৫০০ কোটি টাকা বা তার চাইতেও বেশি।সরকারের পোশাক শিল্পের সংগঠন বিজিএমইএ ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সামনে রেখে ৫০ বিলিয়ন ডলার রফতানি আয়ের লক্ষ্য নিয়ে ‘পথনকশা ২০২১’ ঘোষণা করে এবং এজন্য সরকার আন্তরিকতার সাথে কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু আমাদের বড় বাঁধা বা চ্যালেঞ্জ হচ্ছে চীন,ভিয়েতনাম এবং ভারত। সঠিক পরিকল্পনা না থাকলে আমরা আমাদের দ্বিতীয় অবস্থান ভারত ও ভিয়েতনামের কাছে। তবে আশার কথা হচ্ছে, ২০২০ সালের মধ্যেই চীনকে টপকে যাবে বাংলাদেশ। ড্র্যাপার্স নামক ব্রিটিশ দৈনিকে এ সংক্রান্ত তথ্য দিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে ড্র্যাপার্স জানাচ্ছে, গত ৯ বছরের তুলনায় শুধু ২০১৬ সালেই বাংলাদেশ থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভূক্ত দেশ গুলোতে তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে প্রায় দ্বিগুণ। টেক্সটাইল ইন্টেলিজেন্স রিপোর্টে দেখা গেছে, গত নয় বছরে এ হার ১২.২ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৩.৪ শতাংশে। তবে, গত ছয় বছরেই ইউভূক্ত দেশ গুলোয় চীনের রপ্তানিকৃত পোশাকের পরিমাণ হচ্ছে ৩৭.৯৯ শতাংশ। যদিও ২০১০ সালের দিকে সেখানকার বাজারে অর্ধেকের ও বেশি পোশাক আমদানি হয়েছিলো চীন থেকে। কিন্তু ২০১৬ সালে আগের অবস্থান হারিয়ে তিন এ নেমে এসেছে চীন। ২০১৩ সালের পর থেকে দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রেখে ইউরোপের দেশ গুলোতে সব চেয়ে সস্তায় তৈরি পোশাক রপ্তানি করছে বাংলাদেশ। চ্যালেঞ্জ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও অর্থনীতি বিদ ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ভারত সরকার পোশাক শিল্পে ভর্তুকি দিয়ে বাজার দখল করতে চাইছে, এটা বাংলাদেশের জন্য শঙ্কার । তিনি আরও বলেন, পোশাক শিল্পের বাজার ধরে রাখতে হলে ভারতের সাথে প্রতিযোগিতা করে টিকতে হবে। এজন্য সরকারের আরও উদ্যোগী হওয়া দরকার। ’২০২১ সালের মধ্যে আমাদের লক্ষ্য পূরণের জন্য অবশ্যই প্রতিটি দেশকেই মোকাবেলা করতে হবে এবং সঠিক পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করে যেতে হবে।

সর্বশেষ কিছু কথা না বললেই নয়। আমরা অনেকেই হয়তো জানি না “যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি পাঁচ জনের মধ্যে একজন বাংলাদেশের তৈরি ডেনিম জিনস ব্যবহার করে। আর ইউরোপীয়দের মধ্যে প্রতি তিনজনে একজন বাংলাদেশের তৈরি টি-শার্ট ব্যবহার করে”। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের। নিপীড়িত-নিঃশেষিত এজাতি আজ মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। সোনার বাংলা গড়তে আজ তাঁরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। ‘পথনকশা ২০২১’সত্যি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। তবে পথ নকশা ঘোষণাই যথেষ্ট নয়। বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা সেটাই আসল। প্রত্যাশা থাকবে, অতীতের অনেক পরিকল্পনা মতো শুধু ঘোষণায় সীমাবদ্ধ না রেখে ‘পথনকশা ২০২১’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে মালিক, শ্রমিক, শুভাকাঙ্ক্ষী,সর্বো পরিজন গণকে সঙ্গে নিয়ে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালন করবে ।

Writer:
Md. Rezaul Islam (Nipu)
WUB
Campus Ambassador, Bunon

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

নিটারের শিক্ষার্থীদের নাসা স্পেস অ্যাপস চ্যালেঞ্জ জয়

টানা ষষ্ঠবারের মতো বেসিসের তত্ত্বাবধানে এবং বেসিস স্টুডেন্টস ফোরামের সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মহাকাশ সংস্থা নাসার উদ্যোগে আঞ্চলিক পর্যায়ে অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে...

লিভিং অর্গানিজম থেকে টেকসই টেক্সটাইলের উদ্ভাবন: পরিবেশ বান্ধব টেক্সটাইলের দিকে অগ্রযাত্রা

টেক্সটাইল শিল্প হল ভোক্তা পণ্য উৎপাদনের বিশ্বের প্রাচীনতম শাখা। এটি একটি বৈচিত্র্যপূর্ণ এবং বৈষম্যময় সেক্টর যেখানে প্রাকৃতিক ও রাসায়নিক ফাইবার (যেমন:...

করোনা প্রতিরোধে গাঁজার মাস্ক!

পরিবেশ দূষণের জন্য বিশ্বজোড়া আন্দোলন চলছে। তবুও পরিবেশ রক্ষায় মানুষ এখনও অনেকটাই সচেতন নয়। এতদিন মানুষই পরিবেশের ক্ষতি করতেন। এবার সেখানেও...

ডুয়েটে মাইক্রোসফট এক্সেল বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত

ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়,গাজীপুরের টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের "ডুয়েট টেক্সটাইল ক্যারিয়ার এন্ড রিসার্চ ক্লাব ( DTCRC) "শিক্ষার্থীদের সফটস্কিল ডেভেলপমেন্টের লক্ষে মাইক্রোসফট...

বিশেষ সাক্ষাৎকার: টেক্সটাইল আইকন ইঞ্জিনিয়ার মোঃ শাখাওয়াত হোসেন

বাংলাদেশে টেক্সটাইল শিল্পের ক্রমেই দ্রুত বিকাশ ঘটে চলেছে এবং বিশ্বমানের টেক্সটাইল শিল্পের কাতারে বাংলাদেশের টেক্সটাইল শিল্প ইতোমধ্যেই নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম...

ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল রেভ্যুলেশনে টেক্সটাইল বিজ্ঞানী রিচার্ড আর্ক রাইটের ভুমিকা |Contribution of Sir Richard Arkwright during industrial revolution.

রিচার্ড আর্করাইট শিল্প বিপ্লবের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেন যখন তিনি স্পিনিং ফ্রেম আবিষ্কার করেছিলেন, যাকে পরে ওয়াটার ফ্রেম বলা হয়।...

নকশি কাঁথা

কাপড়ের উপর তৈরি নকশা করা কাঁথাই নকশি কাঁথা। বিশদভাবে এভাবে বলা যায়, সূক্ষ্ণ হাতে সুঁচ আর বিভিন্ন রঙের সুতায় গ্রামবাংলার বউ-ঝিয়েরা...