31 C
Dhaka
Monday, September 27, 2021
Home News & Analysis International News আগামী দুই বছর বৃদ্ধি পাবে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি

আগামী দুই বছর বৃদ্ধি পাবে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি

বাংলাদেশের সামগ্রিক রফতানির একটি বড় অংশ আসে টেক্সটাইল শিল্প থেকে, যা মোট রফতানির ৮০% এরও বেশি সমন্বিত। প্রাথমিকভাবে বিশ্বজুড়ে ১৬০ টিরও বেশি দেশে টেক্সটাইল পণ্য রফতানিতে মনোনিবেশ করেছেন। রফতানি প্রচার ব্যুরোর পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে গার্মেন্টস রফতানি থেকে দেশটি ২৮.৫ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে, যা বার্ষিক প্রবৃদ্ধিতে ১১.১ শতাংশ নিবন্ধিত হয়েছে। নিটওয়্যারের রফতানি হয়েছে ১৫.৩৬ বিলিয়ন ডলার, বোনা কাপড়ের চালনা ১৩.১৯ বিলিয়ন ডলার এনেছে, যার ফলস্বরূপ বছরে বছরে ২০.৫৫% এবং ১.৮০% বৃদ্ধি পেয়েছে। রফতানির তথ্য মতে, বাংলাদেশের পোশাক খাত পশ্চিমা দেশগুলির চাহিদাতে দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা পূর্ববর্তী স্তরের বৃদ্ধির দ্রুত প্রত্যাশার ইঙ্গিত দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় আগামী দুই বছর বর্তমানের থেকে বেশি বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক আমদানি করবে যুক্তরাষ্ট্র।

একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের সবচেয়ে বড় রফতানি বাজার যুক্তরাষ্ট্র। করোনা পরিস্থিতিতেও গত অর্থবছরে (২০২০-২১) দেশটিতে পোশাক রফতানি বেড়েছে ১৩ শতাংশের বেশি। মোটা দাগে বাংলাদেশে দুই ধরনের পোশাক রপ্তানি করে, ওভেন ও নিট৷ এর মধ্যে ওভেন অর্থাৎ জামা-কাপড়ের বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র। দেশটিতে বিস্তৃত পরিসরে টিকা কার্যক্রম চালু করতে নতুন প্রেসিডেন্ট বাইডেন যেসব উদ্যোগ নেয়ার কথা বলছেন তাতে সামনের দিনে সেখানে পোশাক রপ্তানি ইতিবাচক ধারায় ফিরবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সাম্প্রতিক এক জরিপে উঠে এসেছে, অন্তত আগামী দুই বছর এ প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় থাকবে। এ সময় বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক ক্রয় বাড়িয়ে তুলতে যাচ্ছে মার্কিন খুচরা বিক্রেতা (রিটেইলার) প্রতিষ্ঠানগুলো। এসব রিটেইলার প্রতিষ্ঠানের কেনাকাটা সংশ্লিষ্ট শীর্ষ নির্বাহীরা জানিয়েছেন, মূলত বাংলাদেশী পোশাকের মূল্য সুবিধাকে কাজে লাগাতেই ক্রয় বাড়ানোর কথা ভাবছেন তারা। ইউনিভার্সিটি অব ডেলাওয়ারের ফ্যাশন অ্যান্ড অ্যাপারেল স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. শেং লুর তত্ত্বাবধানে জরিপটি পরিচালিত হয়েছে।

চলতি বছরের এপ্রিল-জুন পর্যন্ত তিন মাসব্যাপী এ জরিপ কার্যক্রম চালানো হয়। মার্কিন সংগঠন ইউনাইটেড স্টেটস ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের (ইউএসএফআইএ) পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত এ জরিপে পাওয়া তথ্য সম্প্রতি ‘২০২১ ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি বেঞ্চমার্কিং স্টাডি’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে প্রকাশ হয়েছে। মার্কিন ফ্যাশন পণ্য বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পোশাক ক্রয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত (সোর্সিং এক্সিকিউটিভ) নির্বাহীদের ওপর জরিপটি চালানো হয়। জরিপে অংশ নেয়া মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাহীরা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক সরবরাহের সবচেয়ে বড় উৎস এশিয়ার দেশগুলো। এর মধ্যে শীর্ষস্থানে রয়েছে চীন। গত বছর মার্কিন রিটেইলারদের ৯৩ শতাংশই চীন থেকে পোশাকের সরবরাহ নিয়েছে। ভিয়েতনাম ও ভারত থেকে নিয়েছে যথাক্রমে ৮৭ ও ৭৭ শতাংশ। চতুর্থ স্থানে থাকা বাংলাদেশ থেকে সরবরাহ নিয়েছে ৭৩ শতাংশ। জরিপে ৮৫ শতাংশের বেশি অংশগ্রহণকারী জানিয়েছেন, আগামী দুই বছর তারা এশিয়ার বেশ কয়েকটি উৎস দেশ থেকে পোশাক ক্রয় বাড়াবেন। বাংলাদেশ ছাড়াও তাদের এ আগ্রহের তালিকায় রয়েছে ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া । জরিপে জানা যায়, অন্তত আগামী দুই বছর পোশাক রফতানির প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় থাকবে। এ সময় বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক ক্রয় বাড়িয়ে তুলতে যাচ্ছে সব মার্কিন খুচরা বিক্রেতা (রিটেইলার) প্রতিষ্ঠান।

এদিকে রিটেইলার প্রতিষ্ঠানের কেনাকাটা সংশ্লিষ্ট শীর্ষ নির্বাহীরা জানান, মূলত বাংলাদেশি পোশাকের মূল্য সুবিধাকে কাজে লাগাতেই কেনার পরিমাণ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছেন তারা। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ব্যবস্থাপনা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ম্যাকেঞ্জির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,পোশাক কারখানার নিরাপদ ইকমার্স পরিবেশ এবং সরবরাহ চেইনে দায়িত্বশীলতা বিবেচনায় বাংলাদেশের পোশাক খাত এখন প্রথম সারির।তবে কভিড-পরবর্তী বিশ্বে পোশাক পণ্য উৎপাদনে বৈচিত্র্যের ঘাটতি বাংলাদেশী সরবরাহকারীদের জন্য ভোগান্তির কারণ হয়ে উঠবে।চলমান মহামারী ক্রেতাদের পণ্যের চাহিদায় পরিবর্তন এনেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, ক্রেতাদের মধ্যে এখন মৌলিক পণ্যের চেয়ে সোয়েটার, স্মক ড্রেস, সোয়েটপ্যান্টের মতো পণ্যের চাহিদা বেশি। নতুন এসব পণ্যের চাহিদা পূরণে বাংলাদেশের চেয়ে ভিয়েতনাম অনেক বেশি সফল। এ অবস্থায় কভিড-পরবর্তী বিশ্বে মার্কিন ফ্যাশন কোম্পানিগুলোকে আকর্ষণ করা বাংলাদেশী বিক্রেতাদের জন্য জটিল হয়ে উঠবে।

বাংলাদেশ প্রসঙ্গে জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৪৮ শতাংশ বলেছেন, তারা বাংলাদেশ থেকে পোশাক ক্রয়ের উেস পরিবর্তন আনবেন না। বরং ভেন্ডরের সংখ্যা কমিয়ে আনবেন। ফলে বাংলাদেশী পোশাক সরবরাহকারীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা আরো তীব্র হয়ে উঠবে। প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে পণ্য সরবরাহে সক্ষম সরবরাহকারীরা এক্ষেত্রে সুবিধা পেলেও বিপাকে পড়বেন ক্ষুদ্র ও কম সক্ষমতার সরবরাহকারীরা।

প্রশ্নোত্তরভিত্তিক এ জরিপে বিভিন্ন দেশের পোশাক শিল্প নিয়ে মূল্যায়ন করেছেন অংশগ্রহণকারীরা। মার্কিন রিটেইলার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাহীরা মনে করছেন, পোশাকের সোর্সিং কস্ট বা উৎসমূল্য ও বাণিজ্য ব্যয় বিবেচনায় বাংলাদেশ এখনো আকর্ষণীয়। মূলত এ কারণেই মার্কিন রিটেইলারদের মধ্যে বাংলাদেশ নিয়ে আগ্রহ   বাড়ছে।

বাংলাদেশ গার্মেন্ট বায়িং হাউজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কাজী ইফতেখার হোসেন বলেন, বাংলাদেশ এখন ভালো পণ্য তৈরি করছে। সেই পণ্যগুলো আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন। এর পাশাপাশি মূল্য সুবিধার কারণেই অনেক ক্রেতা বাংলাদেশমুখী হচ্ছেন। বাংলাদেশ সাপ্লাই চেইনেও বেশ উন্নতি করেছে। পণ্য বিপণন কৌশলে পরিবর্তন এলেও আরো উন্নতি করতে হবে। সার্বিকভাবে বাংলাদেশের পোশাক খাতসংশ্লিষ্টদের দক্ষতা অনেক বেড়েছে। বৈশ্বিকভাবে এখন স্বচ্ছতার বিশেষ গুরুত্ব তৈরি হয়েছে। এক্ষেত্রেও বাংলাদেশ আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বচ্ছ। পাশাপাশি বাংলাদেশ টেকসই পণ্য তৈরির পথেও হাঁটতে শুরু করেছে। এসব কারণেই মার্কিন ক্রেতাদের বাংলাদেশ থেকে পণ্য ক্রয়ের আগ্রহ বেড়েছে।

দেশের পোশাক রফতানিকারক শিল্প-কারখানার মালিক সংগঠন প্রতিনিধিরা বলছেন, সামনের দিনগুলোয় যুক্তরাষ্ট্রে এখান থেকে পোশাক সরবরাহ বাড়ার পূর্বাভাসটি যৌক্তিক ও স্বাভাবিক। বিকেএমইএর হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছর শেষেই যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক সরবরাহে প্রবৃদ্ধির হার ২৫ শতাংশও হতে পারে। যদিও সরকারি প্রক্ষেপণে তা ধরা হয়েছে ১৭ শতাংশের কিছু বেশি। তবে শিল্প খাতসংশ্লিষ্টরা এখন পণ্যে আরো বৈচিত্র্য আনার সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পারছেন। কারণ গোটা বিশ্বেই এখন কৃত্রিম তন্তু থেকে উৎপাদিত পোশাকের চাহিদা বেড়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ এখনো শুধু মৌলিক পোশাক পণ্যের জায়গাটিতেই শক্তিশালী। তবে ধীরে হলেও এখন বৈচিত্র্য বৃদ্ধির সক্ষমতার উন্নয়ন হচ্ছে।

রিপোর্টার:
মিতু রায়
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সটাইলস (বুটেক্স)
ক্যাম্পাস অ্যাম্বাসেডর, বুনন

Most Popular

এওপিটিবি’র মিলনমেলা

সমগ্র বাংলাদেশের অল ওভার প্রিন্টিং সেক্টর নিয়ে কাজ করা সকল ইঞ্জিনিয়ার ও টেকনোলজিস্টদের প্রাণের সংগঠন “অল ওভার প্রিন্টিং টেকনোলজিস্টস অব বাংলাদেশ”।সংগঠনটির...

ভিয়েতনামের বিকল্প খুজঁছে বিশ্বের বিভিন্ন খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান

সাধারনত যে সকল খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো জুতা ও পোশাকের জন্য ভিয়েতনামের কারখানাগুলোর ওপর নির্ভরশীল তারা ভিয়েতনামের বিধিনিষেধের ব্যাপারে খুবই চিন্তিত। যদিও...

অনাবিল প্রশান্তির মনোরম পরিবেশে গড়ে উঠেছে ফতুল্লা এপারেল

তৈরী পোশাক শিল্প বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার। দেশের মোট রফতানি আয়ের  ৮৪% আসে পোশাক খাত থেকে। তাই দিন দিন দেশে...

রপ্তানিতে ভিয়েতনামকে ছাড়িয়ে যাওয়ার জন্য বাণিজ্য নীতির সংস্কারের বিকল্প নেই : বিশেষজ্ঞরা

ব্যাপক বাণিজ্য কূটনীতির সংস্কার এবং অর্থনৈতিক নীতির উন্মুক্ততা ভিয়েতনামকে আজ সেরা ২০ টি দেশের তালিকায় আসতে সাহায্য করেছে। উদাহরনসরূপ ১৯৮০-৯০ সালের...

লীন ম্যানুফ্যাকচারিং | Lean Manufacturing in Garments Quality

সংজ্ঞাঃ লীন ম্যানুফ্যাকচারিং হচ্ছে অপচয় সনাক্তকরণ এবং দূরীকরণের মাধ্যমে ক্রমাগত উন্নয়নের একটি সুশৃঙ্খল নিয়মনীতি। লীন ম্যানুফ্যাকচারিং বৃহৎ...

বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর কাছে মহামারী সহায়তা চেয়েছে কম্বোডিয়ান গার্মেন্টস কর্মীরা

কম্বোডিয়ার গার্মেন্টস কর্মীরা করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে অপ্রাপ্ত লক্ষ লক্ষ ডলার বকেয়া মজুরি পুনরুদ্ধারে সহায়তা করতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পোশাক সংস্থাগুলোর সাহায্য...

একজন ইংরেজ(স্যামুয়েল স্লেটার) কীভাবে টেক্সটাইল শিল্পে বিপ্লব ঘটিয়েছিল | How an Englishman (Samuel Slater) Revolutionized the Textile Industry

স্যামুয়েল স্লেটার একজন আমেরিকান উদ্ভাবক যিনি ১৭৬৮ সালের ৯ জুন জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি নিউ ইংল্যান্ডে রোড আইল্যান্ডের স্ল্যাটারসভিলে শহরে বেশ কয়েকটি...