28 C
Dhaka
Monday, September 27, 2021
Home News & Analysis ঐতিহ্য আধুনিকতায় মসলিন

ঐতিহ্য আধুনিকতায় মসলিন

বাংলাদেশের সুপ্রাচীনকালের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের গৌরবময় স্মারক হলো মসলিন। মসলিন কাপড় বাঙালিরা খুব সুন্দরভাবে তৈরি করত। এটি প্রাচীন এশিয়ীয় এবং ব্যবলীয়নে ব্যাপক জনপ্রীয়তা অর্জন করেছিল। তুলে ধরেছিল বাঙালী জাতির শিল্প সম্ভাবনা। মসলিন কাপড় ছিল মিহি এবং সুক্ষ্ম। এই সুতা তৈরি হত ফুটি কার্পাস তুলা দিয়ে এবং কাউন্ট সর্বোচ্চ ৭০০-৮০০ পর্যন্ত হত।
সুতোর সূক্ষ্মতা, বুনন শৈলী ও নকশার পার্থক্য অনুযায়ী আলাদা করা হতো বিভিন্ন ধরনের মসলিনকে। আলাদা আলাদা নাম থেকে সহজেই মসলিন সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া যায়।

মসলিন কিভাবে বিলুপ্ত হল?

প্রাচীনকাল থেকেই মসলিন শিল্প উচ্চ পর্যায়ে থাকলেও ​পলাশীর যুদ্ধ এর পর ঢাকার মসলিন শিল্পে বিপর্যয় নেমে আসে এবং আঠারো শতকের শেষ দিকে ঢাকাই মসলিনের রপ্তানির পরিমাণ ১৭৪৭ খ্রিস্টাব্দের তুলনায় অর্ধেকে নেমে আসে। যেখানে ১৭৪৭ খ্রিস্টাব্দে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ২৮ লক্ষ ৫০ হাজার সেখানে ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকার মসলিন উৎপাদন হ্রাস পেয়ে দশ লক্ষ রুপিতে এসে দাঁড়ায়।

১৮৪৪ সালে মসলিনের বিলুপ্তির কারন পর্যালোচনা করেন ঢাকার কমিশনার আই. ডানবার। তার মতে মূল কারণগুলো ছিলঃ

এক, ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লবের ফলে সস্তায় সুতা আর কাপড় উৎপন্ন হতে থাকে। ফলে দামি মসলিনের চাহিদা কমে যায়।

দুই, বিলেতের সস্তা সুতা ঢাকায়, ভারতে আসতে থাকে, সে থেকে তৈরি হতে থাকে কাপড়, হারিয়ে যেতে থাকে মসলিন।

তিন, বিলাতে ঢাকাই মসলিনের ওপরে উচ্চহারে কর আরোপ করা হয়, ফলে মসলিনের দাম ওখানে বেড়ে যায় অস্বাভাবিক হারে। স্বভাবতাই বিক্রি কমে যায় মসলিনের।মসলিন শিল্পের অবনতি ও চূড়ান্ত বিলুপ্তির সর্বপ্রধান কারণ (ইংল্যান্ডের শিল্পবিপ্লব এবং আধুনিক বাষ্পশক্তি ও যন্ত্রপাতির আবিষ্কার)।

এভাবে ইংল্যান্ডের শিল্প-কারখানায় উৎপাদিত সস্তা দামের পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় হেরে যায় ঢাকার মসলিনের মতো দামি সূতিবস্ত্র।ভারতে ব্রিটিশশাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে ঊনবিংশ শতাব্দীতে স্থানীয়ভাবে প্রস্তুত করা বস্ত্রের উপরে ৭০ হতে ৮০ শতাংশ কর আরোপ করা হয়, যেখানে ব্রিটেনে প্রস্তুত-করা আমদানীকৃত কাপড়ের উপরে মাত্র ২ থেকে ৪ শতাংশ কর ছিল। এর ফলে ভারতীয় উপমহাদেশের তাঁতশিল্পে ধস নামে।

কথিত আছে, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকেরা মসলিন উৎপাদন বন্ধ করার জন্য মসলিন বয়নকারী তাঁতিদের হাতের বুড়ো আঙুল কেটে দেয়। তবে অধুনা অন্য আরেকটি দাবি বেশ যৌক্তিকভাবে সামনে উঠে এসেছে। তা হল, তাঁতিদের হাত ব্রিটিশরা নয়, বরং তারা নিজেরাই নিজেদের আঙ্গুল কেটে নিত, যাতে এই তাঁতের কাজ আর না করতে

মসলিনকে কেন ফিরিয়ে আনা দরকার?

বর্তমানে মসলিন ফিরিয়ে আনার জন্য সবচেয়ে বড় যে কারণ তা হল বাঙালির ঐতিহ্য রক্ষা।
তাছাড়া এটি ফিরে আসলে নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি হবে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক দিক দিয়ে আরো সমৃদ্ধ হবে । ইউরোপে মসলিনের যে চাহিদা ছিল তা ফিরিয়ে আনা গেলে রপ্তানি বানিজ্য প্রসারিত হবে।

তৈরি পোশাক পণ্যের দ্বিতীয় প্রধান রফতানিকারক হিসেবে বাংলাদেশ এখন বিশ্ববাজারে মর্যাদা ভোগ করছে। মোট রফতানি আয়ে পোশাকের অবদান প্রায় ৮৫ শতাংশ। এই হার প্রতি মাসেই বাড়ছে। বিশ্ববাণিজ্যে বাংলাদেশের এ অবস্থানের হাতেখড়ি হয়েছিল এই মসলিন দিয়েই। ব্রিটিশ শাসনকালে সোনারগাঁর আড়ং থেকে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার মসলিন রফতানি দিয়ে শুরু হয়। ইউরোপ, আরব, আফ্রিকাসহ বিভিন্ন দেশে রাজকীয় পোশাক হিসেবে ঢাকাই মসলিনের ব্যাপক কদর তৈরি হয়। বর্তমান বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি বর্ধনের লক্ষ্য অর্থনৈতিক অবস্থান সুদৃঢ় করণে মসলিনের অবদান অপরিসীম। পাশাপাশি সামাজিক উন্নয়নে তথা বেকারত্ব দূরীকরণে গ্রামীণ পর্যায়ে মসলিন উৎপাদন বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে।

মসলিনকে ​কিভাবে ফিরিয়ে আনা যাবে?

​​তাঁত বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, উইভিংয়ের অগ্রগতি ৮০ ভাগ। মসলিনের তুলা ও সুতা শনাক্তকরণ-সংক্রান্ত গবেষণা কার্যক্রমের অগ্রগতি ২০ এবং স্পিনিংয়ের অগ্রগতি ৫৫ ভাগ এগিয়েছে।

মসলিন ফিরিয়ে আনার জন্য সবচেয়ে দরকারি জিনিস হচ্ছে ফুটি কার্পাস তুলা। এই তুলা থেকে উন্নতমানের মসলিন তৈরি করা সম্ভব। সাধারণত সর্বনিম্ন ২৫০ কাউন্ট সুতার তৈরি কাপড়কে মসলিন বলা হয়। কাউন্ট যত বেশি হবে মসলিনের মান ও তত উন্নত হবে। মলমল মসলিন কাপড় ৬০০ কাউন্টের কাছাকাছি সুতা দিয়ে তৈরি হত। কথিত আছে ৫০ গজ মসলিনের কাপড় একটি দিয়াশলাই বক্স এ রাখা যেত। বর্তমানে ব্যবহৃত জামদানী মসলিনের একটি প্রকারভেদ হলেও এটি অপেক্ষাকৃত মোটা সর্বোচ্চ ১০০ কাউন্ট সুতা দিয়ে তৈরি হয়, যেটি মসলিনের ভাব গাম্ভীর্য তুলে ধরেনা।

বাংলাদেশ তুলা গবেষণা কেন্দ্রে ফুটি কার্পাস তুলা চাষের পরিকল্পনা নেয়া হয় এবং চাষ করা হয়। সেখানে পরে ৩০০ কাউন্ট সুতা তৈরি সম্ভব হয়।

পরবর্তীতে তাতিরা সেখান থেকে কাপড় তৈরি করে, প্রথম দিকে এত পাতলা সুতা হওয়ায় তা ছিড়ে যাচ্ছিল। তবে অভিজ্ঞ তাতিরা আসতে আসতে সেটি সম্ভব করেছে এবং পরবর্তীতে আরো বেশি বেশি কাউন্ট এর সুতা দিয়ে কাপড় তৈরি করা সম্ভব।
মসলিন বানানো সম্ভব হলে বিভিন্ন কারখানা তৈরি হবে এবং কর্মসংস্থান তৈরি হবে।

মসলিন তৈরির কাজটি ছিল ভীষন জটিল, কঠিন, সময়সাধ্য- তারচেয়েও বড় কথা সেটা তৈরির জন্য দরকার হতো অসামান্য নৈপুণ্য আর পরম ধৈর্য।

যে বিষয়গুলো অধিক খেয়াল রাখা প্রয়োজন তা হল:

-আধুনিক লুম মেশিনে এ সুতা তৈরি করা গেলে সময় সাশ্রয় হবে। তবে এক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে যে, মসলিন কাপড়ের দাম যেন অত্যাধিক বেশি না হয় ।

-বর্তমান পেক্ষাপট অনুযায়ী আধুনিক ডিজাইন যুক্ত মসলিন কাপড় তৈরি করতে হবে। আধুনিক কালার কম্বিনেশন ব্যবহার করতে হবে।

-শাড়ি ছাড়াও আন্তর্জাতিক চাহিদার সঙ্গে মিল রেখে ফ্যাশনদুরস্ত পোশাক করা গেলে বর্তমানের মৌলিক মানের পোশাক থেকে উচ্চমূল্যের পোশাক রফতানির সুযোগ নেওয়া সম্ভব হবে। রফতানি পণ্যে বৈচিত্র্য আসবে।

-ভোক্তা চাহিদাকে প্রাধান্য দিতে হবে।

সবকিছু ঠিক থাকলে আবারো রাজত্ব করবে মসলিন তার স্ব-মহিমায়।

Writer:
Md. Zamil Mia
STEC
Campus Ambassador, Bunon

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

এওপিটিবি’র মিলনমেলা

সমগ্র বাংলাদেশের অল ওভার প্রিন্টিং সেক্টর নিয়ে কাজ করা সকল ইঞ্জিনিয়ার ও টেকনোলজিস্টদের প্রাণের সংগঠন “অল ওভার প্রিন্টিং টেকনোলজিস্টস অব বাংলাদেশ”।সংগঠনটির...

ভিয়েতনামের বিকল্প খুজঁছে বিশ্বের বিভিন্ন খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান

সাধারনত যে সকল খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো জুতা ও পোশাকের জন্য ভিয়েতনামের কারখানাগুলোর ওপর নির্ভরশীল তারা ভিয়েতনামের বিধিনিষেধের ব্যাপারে খুবই চিন্তিত। যদিও...

অনাবিল প্রশান্তির মনোরম পরিবেশে গড়ে উঠেছে ফতুল্লা এপারেল

তৈরী পোশাক শিল্প বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার। দেশের মোট রফতানি আয়ের  ৮৪% আসে পোশাক খাত থেকে। তাই দিন দিন দেশে...

রপ্তানিতে ভিয়েতনামকে ছাড়িয়ে যাওয়ার জন্য বাণিজ্য নীতির সংস্কারের বিকল্প নেই : বিশেষজ্ঞরা

ব্যাপক বাণিজ্য কূটনীতির সংস্কার এবং অর্থনৈতিক নীতির উন্মুক্ততা ভিয়েতনামকে আজ সেরা ২০ টি দেশের তালিকায় আসতে সাহায্য করেছে। উদাহরনসরূপ ১৯৮০-৯০ সালের...

মিশরীয় পোশাক কথন

প্রাচীন মিশর প্রাচীনতম সভ্যতার একটি, যার নিজস্ব রাজনৈতিক ব্যবস্থা, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ, ধর্ম, বিশ্ব দর্শন এবং অবশ্যই, ফ্যাশন। এই রাষ্ট্রের বিবর্তন এখনও...

Textile Manufacturing Facts | টেক্সটাইল উৎপাদন তথ্য

১. একটি টি-শার্ট বানাতে যে পরিমাণ তুলো লাগে তা উৎপাদন করার জন্য ২৭০০ লিটার পানির প্রয়োজন হয়।

রেমি ফাইবার | Ramie Fiber

রেমি প্রাচীনতম উদ্ভিজ্জ ফাইবারের মধ্যে অন্যতম একটি এবং এটি হাজার হাজার বছর ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। প্রায় ২ হাজার বছর আগে...