28 C
Dhaka
Friday, October 22, 2021
Home Fiber To Fabric Fabric গালিচার(কার্পেট) একাল-সেকাল | Past & Present of Carpet

গালিচার(কার্পেট) একাল-সেকাল | Past & Present of Carpet

Red carpet welcome বা লাল গালিচার সর্ম্বধনা কথাটি শুনলে মনের পর্দায় ভেসে উঠে রাজা – বাদশা, মন্ত্রি ও গন্যমান্য ব্যক্তি ও সেলিব্রেটিদের কথা, ভেসে উঠে বিজয়ী বীরের কথা, ভেসে উঠে দেশের মুখ উজ্বল করা কোন দেশ প্রেমিক নাগিরকের গৌরবময় কর্মের কথা।আবার, মনে ভেসে উঠে রূপকথার জাদুর কার্পেটের কথা যেখানে দৈত্য উড়ে যাচ্ছে রাজকুমার কিংবা রাজকন্যাকে নিয়ে। স্মার্টফোন, স্মার্টঘড়ি, স্মার্ট অফিস, স্মার্ট বাড়ি…. ইত্যাদি বর্তমানের ট্রেন্ড। অথচ, স্মার্ট কার্পেট থাকবে না তা কি করে হয়? হ্যা, স্মার্ট কার্পেট ও তৈরি হয়েছে যা আাপনাকে মুহুর্তেই জানিয়ে দিবে ঘরের মেঝের কি অবস্থা, কেউ মেঝেতে পড়ে আছে কিনা ও মেঝেতে ময়লা জীবানু কিছু আছে কিনা। এছাড়াও আরো অনেক তথ্য জানতে পারবেন। কার্পেট থাকবে অথচ এলার্জি ও ডাস্টের সমস্যা থাকবেনা এটা কি করে হয়? চিন্তার কিছু নেই, এন্টিএলার্জি ও এন্টিডাস্ট কার্পেট আপনি পেয়ে যাবেন সামনের দিনগুলোতে। কার্পেটের অতীত,বর্তমান ও ভবিষৎ ও এর ব্যবহারের আদ্যোপান্ত নিয়ে আজকের এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদন।

কার্পেট কিঃ

কার্পেট হচ্ছে একটি Textile floor। ফার্সি ভাষায় কার্পেটকে বলে ফার্শ্। পশুরলোম দিয়ে প্রস্তুতকৃত ঘরের মেঝেতে পাতবার ফার্শবিশেষ যা কর্পেট বা গালিচা নামে সকলের কাছে পরিচিত। বিচিত্র রঙের তুলার সূতা, পশমি সূতা, রেশমি সূতায় বিভিন্ন ডিজাইনের গালিচা বা কার্পেট তৈরি করা হয়। ঐতিহ্যগতভাবে প্রথমে কার্পেট তৈরি করা হতো মেষ বা দুম্বার লোম বা উল দিয়ে তবে বিশ শতকের পর থেকে পলিপ্রোপিলিন নাইলন বা সিন্থেটিক ফাইবার গুলো উলের তুলনায় হালকা,সহজলভ্য, টেকসই এবং দামে কম হওয়ায় কার্পেট তৈরিতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

কার্পেটের ইতিহাসঃ

কোন সময়, কোন এলাকায়, কোন জাতি সর্বপ্রথম গালিচা তৈরি করেছিল তার সুনির্দিষ্ট তথ্য এখনও জানা যায়নি। তবে, ঐতিহাসিকদের মতের ভিন্নতার শর্তে ও যে তথ্যগুলো সামনে এসেছে সেগুলো বর্ণনা করা হলো-

কারুকার্যময় পারস্যের গালিচার কথা সকলেই কম বেশি শুনেছেন। তখনকার সময়ে পারস্যের মানুষ নিত্য ব্যবহার্য সামগ্রী হিসাবে গালিচা তৈরি ও ব্যবহার করত। সাধারণত ঠান্ডার থেকে বাঁচার জন্য ও বাড়ির মেঝে বা দেওয়ালকে সাজানোর জন্য এই গালিচা বানানো হতো সেই সময়। তখন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই শিল্প প্রচলিত হয়ে আসছে।

মনে করা হয় যে পারস্যেরও আগে কারুকার্যখচিত গালিচার পীঠস্থান ছিল তৎকালীন ব্যাবিলনে। সম্রাট সাইরাস ব্যাবিলন আক্রমণ করলে তিনি সেখানকার গালিচাশিল্প দেখে মুগ্ধ হন এবং ঐতিহাসিকদের মতে তিনিই পারস্যে গালিচা শিল্পের পত্তন ঘটান। এরপরে বহু রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে গালিচা শিল্প হস্তান্তর হতে থাকে। এরপর পারস্যে আরবী রাজত্ব শেষ হয় সেলজুক জাতির আক্রমণের মধ্যে দিয়ে। পারস্যের গালিচার মান উন্নয়ন ও বিশ্বব্যাপি প্রচারে এই সেলজুকদের ভূমিকা ছিল প্রধান। সেলজুক জাতির মেয়েরা গালিচার বুননে অসামান্য পারদর্শী ছিল।আজারবাইজানের মতো দেশে আজও এই শিল্পকুশলতা চোখে পরে।

ষোড়শ শতাব্দিতে পারস্যের গালিচা খ্যাতি ও উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছায়। এই সময়ের সাফাভি রাজবংশ গালিচার নকশার উন্নতির জন্য বহু পরীক্ষানিরীক্ষা চালায় এবং এর জন্য নির্দিষ্ট কর্মচারী রাখে। এদের মধ্যে প্রধান ছিলেন সম্রাট শাহ আব্বাস, যিনি ইউরোপের সাথে বাণিজ্যসম্পর্ক স্থাপন করেন এবং গালিচাকে পশ্চিমের একটি জনপ্রিয় বিলাসদ্রব্যে পরিণত করেন।

১৫০০ শতাব্দিতে কার্পেটের জন্মস্থান মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার পরে ইউরোপে কার্পেটের উৎপাদন ও ব্যবহার বৃদ্ধি পেতে থাকে।
আজ অবধি পৃথিবীতে টিকে থাকা প্রাচীনতম কার্পেটটি হলো “প্যাজারিক কার্পেট”। ১৯৪৫ সালে সাইবেরিয়ার একটি কবরস্থানে পাওয়া যায়। এই আর্কষনীয় সুপ্রাচীনতম কার্পেটটি লম্বায় ও চাওড়ায় ছিল ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেন যে, এটি ছয় হাজার বছর পুরনো কার্পেট যা আর্মেনিয়া থেকে এসেছিল, খ্রিস্টপূর্ব ৫ম – ৪র্থ শতাব্দীর সময়কালের যা হাজার হাজার বছর ধরে বরফের নিচে সংরক্ষিত অবস্থায় ছিল। সেসময় ব্যবসা- বানিজ্যে কার্পেট বেশ মূল্যবান পণ্য হিসাবে ব্যবহৃত হবার এটি প্রথম উদাহরণ।

কার্পেট উৎপাদনকারী দেশ :

কার্পেট কেবল একটি পণ্যই নয় এটি একটি সৃজনশীল শিল্প। প্রাচীনকাল থেকেই বিশ্ববাসী ইরানকে চেনে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পের কারণে।

ইরানি নরনারীদের মেধা ও মনন খাটিয়ে তৈরি হয় এই শিল্পপণ্য। তাদের অভিরুচির পরিচয় ফুটে ওঠে হাতে বোনা কার্পেটের রং, রূপ ও ডিজাইনের মধ্যে দিয়ে। আজও বিশ্বেব্যাপি ইরানিদের হাতে বোনা কার্পেট প্রসিদ্ধ । তবে, বর্তমানে কার্পেট উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় রয়েছে – যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য , ভারত , আফগানিস্তান,পাকিস্তান, আর্মেনিয়া, তুরস্ক, স্পেন, ফ্রান্স, চায়না, আজারবাইজান, বেলজিয়াম, মিশর।

কার্পেট তৈরিতে ব্যবহৃত তন্তু বা ফাইবারের প্রকারভেদঃ

বর্তমানে প্রাকৃতিক তন্তুগুলির মধ্যে পশম, উল,তুলা,সিল্ক, পাট ও কিছু উদ্ভিজ্জ তন্তু ছাড়াও কিছু রাসায়নিক ও জৈব রাসায়নিক তন্তু কার্পেট তৈরিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়ে কার্পেট শিল্পে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনে দিয়েছে। যার ধারাবাহিকতায় কার্পেট শিল্পের ক্রমবর্ধমান ও ক্রম উন্নতি অগ্রযাত্রা অব্যহত রয়েছে। বর্তমানে কার্পেট তৈরিতে যেসকল রাসায়নিক তন্তু গুলো ব্যবহৃত হয় সেগুলো হলো- নাইলন, পলিয়েস্টার,ওলেফিন, অ্যাক্রিলিক, ট্রাইেক্সটা। প্রাকৃতিক তন্তু দিয়ে তৈরি কার্পেট মসৃন,নরম, আরামদায়ক ও ভারি হয় ,এদের বুননে সময়ও বেশি লাগে এবং তুলনামূলক এগুলোর দাম ও অনেক বেশি। অপরদিকে, রাসায়নিক ফাইবার থেকে উৎপাদিত কার্পেটগুলো হয় রঙে চাকচিক্য ও বিচিএ ডিজাইনের, ওজনে হালকা,নরম, টেকসই, দাগ ও ক্ষয় প্রতিরোধী এবং এগুলোর দাম তুলনামূলক কম, পানির সংস্পর্শে এলে এই কার্পেটগুলো দ্রুত নষ্ট হয়ে যায় না। এদের মধ্যে নাইলনের কার্পেটগুলোর ইলাস্টিসিটি বেশি। তাই ভারী আসবাব নিশ্চিন্তে রাখা যায়।

কার্পেট টেক্সচার:

কার্পেটের টেক্সচার বলতে বোঝায় যে কার্পেটের তন্তুগুলি কার্পেটের ব্যাকিংয়ের সাথে কীভাবে সংযুক্ত থাকে। তিন ধরণের কার্পেট টেক্সচার রয়েছে। যেমনঃ
১) Cut pile : যে কার্পেটে সুতাগুলোকে প্রান্তে কাটা হয় সেগুলোকে cut pile বলা হয়। বাজারে ৫ রকমের cut pile কার্পেট রয়েছে – ভেলভেট, স্যাক্সনি, ফ্রিজ, শ্যাগ এবং ক্যাবল। প্রতিটিরই আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
২) Loop : এ কার্পেটের সুতাগুলো কার্পেটের পৃষ্ঠে লুপযুক্ত করা হয় এবং সুতাগুলোকে কাটা হয় না। Berber স্টাইলের কার্পেট লুপ কার্পেটের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয়।
৩) Cut – Loop : এ কার্পেটে বিভিন্ন ভাস্কর্যযুক্ত ডিজাইনগুলো high cut tufts এবং lower loop এর সংমিশ্রণে যুক্ত করা হয়।

কার্পেট রঙ করার পদ্ধতি :

দুইটি পদ্ধতিতে কার্পেট রঙ করা হয় , PRE-DYED পদ্ধতি এবং POST-DYED পদ্ধতি।Pre-dyed পদ্ধতিতে ফাইবারগুলোকে কার্পেটে যুক্ত করার পূর্বে রং করা হয়। এ পদ্ধতিতে কার্পেটটি বেশ মজবুত হয় এবং এর রং সহজে বির্বণ হয় না।

পৃথিবীর সবথেকে দামী ও বিলাসবহুল কার্পেটঃ

Silk Isfahan Rug বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল গালিচা। এটিতে নিখুঁত রঙের ব্যবহার ও ব্যতিক্রমী নকশা করা হয় এবং খাঁটি রেশম সুতা দিয়ে বুনা হয় বলেই এ কার্পেটটি সারাবিশ্বের এতো মূল্যবান। ২০০৮ সালে এটি বিক্রি হয় ৪৪ লক্ষ ৫০০ মার্কিন ডলারে। Ziegler Mahal Carpet(3) বিশ্বে দ্বিতীয় দামী কার্পেট যেটা বিক্রি হয়েছে ১৮,২৫০০ মার্কিন ডলারে। রং, নকশা ও অনন্য নির্মানশৈলি ও অতুলনীয় মসৃণতার কারনে এটি মূল্যবান হয়ে ওঠেছে।

কার্পেটের ব্যবহার ও চাহিদাঃ

নানা ধরনের বর্ণিল নকশার কার্পেট ঘরের,মসজিদ ও উপাসনালয়ের, অফিসের এবং বিভিন্ন হোটেলের প্রয়োজন ছাড়াও সৌন্দর্য বর্ধনে ডেকোরেশনের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। খেলার মাঠে ও ঘাসের পরিবর্তে টার্ফ বা কার্পেট ব্যবহার করা হচ্ছে। বিভিন্ন গঠন ও বৈচিএের কার্পেটের নানামুখী ব্যবহারের ফলে বিশ্ব বাজারে এর চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে। ২০১৮ সালে এর বাজার ছিল প্রায় ৯৭ বিলিয়ন ডলার এবং এর ব্যবহার ৪.৫% হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং ২০২৬ সালে বিশ্ব বাজারে কার্পেটের চাহিদা হবে প্রায় ১৩৮.৪৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

Writer:
Ayesha Zulkernine
World University of Bangladesh
Research Assistant ,Bunon

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

দক্ষ মানব সম্পদ তৈরিতে পিসিআইইউ ভলেন্টিয়ার্সের এর উদ্যেগ Skill for Career Progression (SCP)

পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অন্যতম বৃহৎ সংগঠন "PCIU Volunteers" আয়োজন করতে যাচ্ছে কর্পোরেট দক্ষতা বিষয়ক প্রোগ্রাম "Skill for Career Progression" (SCP)।

“প্রতিটি ধাপে তোমার যোগ্যতাই তোমাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে” – সালাউদ্দিন

সম্পাদকীয়ঃ লেখক- জনাব সালাউদ্দিন হেড অফ অপারেশন, বুনন চেয়ারম্যান, আস্ক এপারেল এন্ড টেক্সটাইল সোর্সিং লিমিটেড সদ্য টেক্সটাইল পাশ করা অনেক টেক্সটাইল...

এওপিটিবি’র মিলনমেলা

সমগ্র বাংলাদেশের অল ওভার প্রিন্টিং সেক্টর নিয়ে কাজ করা সকল ইঞ্জিনিয়ার ও টেকনোলজিস্টদের প্রাণের সংগঠন “অল ওভার প্রিন্টিং টেকনোলজিস্টস অব বাংলাদেশ”।সংগঠনটির...

ভিয়েতনামের বিকল্প খুজঁছে বিশ্বের বিভিন্ন খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান

সাধারনত যে সকল খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো জুতা ও পোশাকের জন্য ভিয়েতনামের কারখানাগুলোর ওপর নির্ভরশীল তারা ভিয়েতনামের বিধিনিষেধের ব্যাপারে খুবই চিন্তিত। যদিও...

লিভিং অর্গানিজম থেকে টেকসই টেক্সটাইলের উদ্ভাবন: পরিবেশ বান্ধব টেক্সটাইলের দিকে অগ্রযাত্রা

টেক্সটাইল শিল্প হল ভোক্তা পণ্য উৎপাদনের বিশ্বের প্রাচীনতম শাখা। এটি একটি বৈচিত্র্যপূর্ণ এবং বৈষম্যময় সেক্টর যেখানে প্রাকৃতিক ও রাসায়নিক ফাইবার (যেমন:...

বিজিএমইএ’র নির্বাচনে সম্মিলিত পরিষদের জয়

তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ’র নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছে সম্মিলিত পরিষদ।  করোনা মহামারীর মধ্যেই রোববার...

ডেনিম বল ওয়ার্পিং | Ball Warping Machine | Denim Manufacturing

রোপ ডাইং টেকনোলজির ডেনিম ম্যনুফ্যাকচারিং ইউনিট গুলোর প্রডাকশন এর প্রথম ধাপ হলো Ball Warping । এই বল ওয়ার্পিং সেকশনে ইয়ার্ন এর...