18 C
Dhaka
Thursday, February 2, 2023
HomeTechnologyমেডি-টেক্স :মেডিক্যাল এবং টেক্সটাইলের যোগসূত্রে এক সম্ভাবনাময় সেক্টর

মেডি-টেক্স :মেডিক্যাল এবং টেক্সটাইলের যোগসূত্রে এক সম্ভাবনাময় সেক্টর

ব্যাপকতা ও প্রয়োজনীয়তার দিক দিয়ে টেক্সটাইল এর ব্যবহার সর্বত্র। তাই টেক্সটাইল এর ব্যবহার কম পরেনি চিকিৎসাশাস্ত্রেও। টেক্সটাইলের ব্যবহার আজকাল শুধু একই বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। যেমনটি আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে লজ্জা নিবারণের জন্য এই টেক্সটাইল ব্যবহার করে থাকি তা নয়। মেডিক্যাল এবং  টেক্সটাইলের সমন্নয়ে এক ওপার সম্ভাবনা ও বিধিধ ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করব।

প্রথমেই প্রশ্ন আসে মেডিক্যাল টেক্সটাইল আসলে কিভাবে আর কেনই বা এর দরকার? মেডিকেল টেক্সটাইলগুলি সবচেয়ে প্রয়োজনীয় এবং প্রযুক্তিগত টেক্সটাইলের ক্রমবর্ধমান অংশ যা স্বাস্থ্যসেবা বা গণসেবা টেক্সটাইল হিসাবেও পরিচিত। টেক্সটাইল প্রযুক্তি এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিভিন্ন প্রযুক্তির সমন্বয়ে একটি নতুন ক্ষেত্রের সৃষ্টি হয় যেটা আজকের দিনের মেডিক্যাল টেক্সটাইল হিসেবে অধিক পরিচিত। বর্তমান সমাজের বড় জনসংখ্যার আকারের পরিবর্তন, প্রতিটি মানুষের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা, অতি প্রয়োজনীয়তা, মানবিক ক্রিয়াকলাপের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে এবং বিপদাপদ, পরিবহন দুর্ঘটনা, রাসায়নিক পদার্থ, অগ্নি, ঠাণ্ডা, রোগ এবং ভাইরাস।

ব্যকটেরিয়াসহ সভ্যতার পরিবর্তন ঘটছে। এই ধরনের কারণগুলি মেডিক্যাল টেক্সটাইলের চাহিদা বাড়ায় যা জীবন ধারণের জন্য আবশ্যক। 

এবার আসি আমরা মেডিক্যাল শাস্ত্রের কোন কোন ক্ষেত্রে আমরা টেক্সটাইলের ব্যবহার দেখতে পাই। প্রযুক্তির বাজারে  ন্যানো প্রযুক্তির বিকাশ গত দশকে এক অভাবনীয় বিপ্লবের সূচনা করেছে। ন্যানো ফাইবার দিয়ে তৈরি পোশাকগুলো মেডিক্যাল সেক্টরে আজকাল খুব বেশি পরিমাণে ও প্রয়োজনীয় হারে ব্যবহৃত হচ্ছে। যার ফলে চিকিৎসাশাস্ত্রে প্রযুক্তিগত টেক্সটাইলের প্রয়োগ ব্যপকহারে লক্ষ্য করা যায়।

চিকিৎসা ক্ষেত্রে ঔষধ শিল্পে টেক্সটাইল প্রযুক্তির  ইতিহাস ও ব্যবহার শুরু আজকে থেকে নয় বেশ পুরনো। এর ইতিহাস ঘাঁটলে লক্ষ্য করা যায়। খ্রিস্টপূর্ব ২১০০ অব্দ থেকে বিভিন্ন ব্যান্ডেজ, প্লাস্টার তৈরিতে এর ব্যবহার করত বলে জানা যায়।

চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা পণ্যের জন্য টেক্সটাইল সামগ্রী ব্যবহার মূলত নিম্নলিখিত ক্ষেত্রগুলিতে শ্রেণীবদ্ধ করা যায়-

১. ব্যান্ডেজ, ক্ষত ড্রেসিং, প্লাস্টার, গেজ ইত্যাদি দ্রব্যাদি তৈরিতে।
২. কৃত্রিম লিগামেন্ট তৈরিতে, কৃত্রিম কিডনি, কৃত্রিম যকৃত, কৃত্রিম ফুসফুস তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
৩. চিকিৎসার প্রয়োজনীয় অপারেটিং গাউন, অপারেটিং ড্রেস, স্টারলাইজেশন প্যাকগুলি, ড্রেসিং, সিউচার এবং অস্থিরোপকারী প্যাড।
৪. ননওভেন গাউন সহ মেডিক্যাল গ্লাভস, গাউন, মাস্ক, শিশুর ডায়াপার, স্যানিটারি ন্যাপকিন, সারজিকাল ক্যাপ, প্লাস্টার ইত্যাদি।

মেডিকেল টেক্সটাইল জন্য অনেকগুলো আবশ্যিক বৈশিষ্ট্যাবলী প্রয়োজন –

১. প্রথমত ও প্রধানত এতে কোন বিষাক্ত উপাদান থাকবেনা।
২. এটি রাসায়নিকভাবে নিষ্ক্রিয় হতে হবে।
৩. আদ্রতা শোষণ ক্ষমতা থাকবে।
৪. ঘাত সহনীয়, স্থায়ীকতা, নমনীয়তা ও কোন আঘাত অথবা বল সহ্য করার ক্ষমতা থাকতে হবে।
৫. এসিড, ক্ষার ও মাইক্রো-অর্গানিজম জাতীয় পদার্থের ভাল প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকতে হবে।

এক্ষেত্র ব্যবহৃত ফাইবার গুলোর কিছু শ্রেণীবিভাগ করা যেতে পারে–
১. প্রাকৃতিক ফাইবার –কটন , সিল্ক ফাইবার প্রভৃতি।
২. সিনথেটিক ফাইবার- পলি-এস্টার, ভিসকোস, পলিঅ্যামাইড, পলি-প্রপাইলিন, কার্বন, গ্লাস ইত্যাদি ফাইবার

মেডি টেক্সটাইলের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাঃ

প্রায় 100 বছর পরে বিশ্ব 2020 সাল থেকে COVID-19 ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট আরও একটি মহামারী রোগের শিকার হচ্ছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ১৯৯ টি বা তারও অধিক দেশে এই ভাইরাসটি পাওয়া গেছে। ইউএসএ, ইতালি, স্পেন, ইরান, চীন, যুক্তরাজ্য এর মতো দেশগুলো মারাত্মকভাবে ভুগছে। করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসার জন্য চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত সুরক্ষামূলক সকল সরঞ্জাম পিপিই, গ্লাভস, মাস্ক পরতে হয় যা মেডিকেল টেক্সটাইল আওতাধীন। বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে পোশাকশিল্পের সংগঠন বিজিএমইএ এর তথ্য অনুযায়ী ২০২০ সালের মার্চ থেকে জুলাই—এই পাঁচ মাসে ২ কোটি ৬৯ লাখ ডলারের মাস্ক রপ্তানি হয়েছে কিন্তু ২০১৯ সালে রপ্তানি হয়েছিল মাত্র ২৭ লাখ ডলারের মাস্ক। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে করোনার হার প্রায় ৩০ শতাংশ। অর্থাৎ করোনা সংক্রমণ বেড়েই চলেছে যেখানে মাস্ক সহ সকল প্রয়োজনীয় জিনিস এর চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সম্পূর্ণ নিরাপত্তা ও চাহিদার উপর ভিত্তি করে বলা যায় মেডিকেল টেক্সটাইল অর্থাৎ পিপিই,মাস্ক, গাউন,গ্লোবস ইত্যাদির চাহিদা বাড়তেই থাকবে

মেডিকেল টেক্সটাইলগুলি কেবলমাত্র হাসপাতাল, স্বাস্থ্যবিধি, এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতে নয়, এমনকি হোটেল এবং অন্যান্য পরিবেশে যেখানে স্বাস্থ্যকরনের প্রয়োজন রয়েছে তার বিস্তৃত প্রয়োজনের কারণে তাদের একটি বিশাল বাজার রয়েছে। বিভিন্ন মেডিকেল পণ্য তৈরিতে প্রাকৃতিক পাশাপাশি সিন্থেটিক ফাইবারের/ কৃত্রিম ফাইবার ব্যবহার তীব্র বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি পূর্বাভাস ছিল যে মেডিকেল-টেক্সটাইল পণ্যগুলির বার্ষিক প্রবৃদ্ধি সম্ভবত ১৯৯৯-২০০০ সালে প্রায় ১০% হতে পারে। অস্ত্রোপচারের কীট, মাস্কস এবং অস্ত্রোপচার কক্ষে ব্যবহৃত অন্যান্য কীটের মতো ডিসপোজেবল মেডিকেল টেক্সটাইলের চাহিদা ২০০২ সালে ২.৯ বিলিয়ন ডলার হবে বলে আশা করা হয়েছিল। একইভাবে, ইইউতে ব্যক্তিগত পণ্য এবং ক্ষত ড্রেসিং বিপণনের মাধ্যমে উৎপন্ন রাজস্ব 2003 সালে 21.1% বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হয়েছিল। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, অপারেটিং রুমগুলিতে নন বোনা পণ্য ব্যবহারের ফলে বছরে সর্বনিম্ন ৫১০ মিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হবে। চাহিদা বৃদ্ধি এবং মেডিকেল টেক্সটাইলগুলি মানুষের স্বাস্থ্যের সাথে জড়িত থাকার বিষয়টি বিবেচনা করে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি কঠোর বিধিবিধান এবং আইন প্রয়োগ করেছে এবং চিকিৎসা পণ্য ব্যবহারের জন্য নির্দেশিকাও জারি করেছে। চিকিৎসাশাস্ত্রের ব্যপক উন্নয়নের লক্ষ্যে মেডিকেল টেক্সটাইলের ব্যপকতা দিন দিন বেড়েই চলেছে।

মূলত প্রযুক্তি টেক্সটাইল নিয়ে আমাদের দেশে কাজ করার অনেক সুযোগ রয়েছে, যেহেতু মেডিক্যাল টেক্সটাইল টেকনিক্যাল টেক্সটাইলের একটি অংশ তাই দুঃখজনক হলেও সত্য আমাদের দেশে এগুলো নিয়ে কাজ কম হচ্ছে। কিন্তু উন্নত দেশগুলো এই ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি করছে । মেডিক্যাল টেক্সটাইলের আরও অনেক অজানা ব্যবহার রয়েছে, যেটা নিয়ে আমাদের এখনো গবেষণা করার সুযোগ রয়েছে। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য এবং যথেষ্ট বিকাশ লাভের জন্য মেডিক্যাল সেক্টরেও টেক্সটাইলের যথেষ্ট বিকাশ ঘটেছে। ফাইবারের শোষণ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য কিছু অধিক শোষণক্ষম জাতীয় পলিমারের উদ্ভব করা হয়েছে যাকে বলা হয় super absorbent। এর পাশাপাশি কৃত্রিম কিডনি, যান্ত্রিক ফুসফুস এবং কৃত্রিম যকৃতের মতো অতিরিক্ত কার্বন যন্ত্রগুলি পরিবর্তন করা হয়েছে যার ফলে চিকিৎসা ক্ষেত্রে কৃত্রিম অঙ্গগুলোর প্রতিস্থাপনের ঘটনা ব্যপকহারে বৃদ্ধিপাচ্ছে। আর বর্তমান প্রেক্ষাপট covid-19 নিয়ে চিন্তা করলে চিকিৎসাশাস্ত্রে টেক্সটাইলের ব্যবহার ও এর প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারব।ন্যনো টেক্সটাইল ব্যবহার করে কোভিড-১৯ এর চিকিৎসার সকল সরঞ্জাম যোগান দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। লক্ষ্য করলে দেখতে পাবো সম্প্রতি পি পি ই,মাস্ক, গ্লোবস এর ঘাটতি পূরণে টেক্সটাইল গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।

লিখেছেনঃ 
আজাদ চৌধুরী
ড. এম. এ. ওয়াজেদ মিয়া টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ
রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট, বুনন
- Advertisment -

Most Popular

রপ্তানিতে ভিয়েতনামকে ছাড়িয়ে যাওয়ার জন্য বাণিজ্য নীতির সংস্কারের বিকল্প নেই : বিশেষজ্ঞরা

ব্যাপক বাণিজ্য কূটনীতির সংস্কার এবং অর্থনৈতিক নীতির উন্মুক্ততা ভিয়েতনামকে আজ সেরা ২০ টি দেশের তালিকায় আসতে সাহায্য করেছে। উদাহরনসরূপ ১৯৮০-৯০ সালের দিকে বাংলাদেশ এবং...

চারুকলা শিক্ষার্থীদের জন্য এওপিটিবিডি-এর কর্মশালা আয়োজন

ডিজিটাল প্রিন্টিংয়ে চারুকলার শিক্ষার্থীদের দক্ষ করার লক্ষ্যে অল ওভার প্রিন্টিং টেকনোলজিস্টস বাংলাদেশ (এওপিটিবিডি) কর্মশালা আয়োজন করেছে। কর্মশালাটি চলবে ৩ মাসবাপী। গত ২১ জানুয়ারি (শুক্রবার) চারুকলার...

Photoshop ব্যবহার করে অল ওভার প্রিন্টিং এর ডিজাইনের Repeat নির্ণয়

Buyer এর কাছ থেকে সাধারণত তিন উপায়ে Design সংগ্রহ করা হয়: 1.Soft Copy 2.Hard Copy 3.Fabric Sample Buyer প্রদত্ত এই তিন ধরনের Sample থেকে প্রথমত Design এর repeat...