28 C
Dhaka
Sunday, September 26, 2021
Home Technology Dyeing & Printing পোশাক প্রযুক্তিতে পানিহীন ডাইং

পোশাক প্রযুক্তিতে পানিহীন ডাইং

টেক্সটাইল জগতে পানির বিকল্প অসম্ভব । আর ডাইং এর ক্ষেত্রে পানি শূন্য হলো জল ছাড়া মাছের মতো। কিন্তু সত্যিই কি তাই ? 

না – সত্যিই এটা নয় । ভাবতেই অবাক লাগছে পানি ছাড়া ডাইং কিভাবে সম্ভব ! প্রযুক্তির এবং গবেষণার অগ্রগতিতে এটাও  সম্ভব হয়েছে । টেক্সটাইল শিল্পে বিভিন্ন ফাইবার থেকে সুতা উৎপাদনের মতো ডাইং ও ফিনিশিং এর যাদুকরী প্রক্রিয়া বর্তমানে মানুষের মনযোগ যেমন আকর্ষণ করেছে তেমনি চাহিদাও বৃদ্ধি করেছে । বর্তমানে বহুল এবং ব্যাপক আলোচিত বিষয় water free dyeing process এর কিছু বিষয় আলোচনা করবো । পূর্ব পদ্ধতি গুলোতে লক্ষ্য করলে দেখা যায় আনুমানিক গরে ১ কেজি টেক্সটাইল দ্রব্য প্রক্রিয়াজাত করতে ১০০-১৫০ লিটার জলের দরকার হতো । ডাইং বিভাগে Pretreatment এবং Finish19ing process যেমন ধৌতকরণ,ব্লিচিং,ডাইং,স্কাউয়ারিং,রাইজিং এর মূল উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয় জল। বস্ত্র শিল্প যেমন বিশ্বের দ্বিতীয় চাহিদা তেমনি বৃহত্তর দূষণকারী শিল্পের খাতায় নাম লিখিয়েছে । যুগের পর যুগ ধরে বস্ত্র শিল্প অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সভ্যতার ধারক বাহক হয়ে অবদান রেখে চলেছে । আর এইজন্যই বস্ত্র শিল্পে রং এর ব্যবহার হয়ে আসছে যা পানির সাথে সম্পৃক্ত।

রঙিন রঙিন জৈব যৌগ গুলো পোশাকের উপর দিয়ে চাকচিক্যতা এবং আকর্ষণীয় করে তোলার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে । টেক্সটাইলের অর্থাৎ বস্ত্র শিল্পের ডাইং প্রসেস এর বর্তমান প্রক্রিয়াটি  চালু আছে,তবে তা অদক্ষ এবং ক্ষতিকারক। ডাইং প্রসেসের সাধারণ কাজ হল কাপড়কে রঙিন করা এবং অতিরিক্ত  রঙ ধুয়ে ফেলা । বেশির ভাগ বাণিজ্যিক ডাইং প্রসেস গুলো ব্যাপক পরিমাণে পানি ব্যবহার করে । উৎপাদিত পণ্যের জন্য ডাই অনুপাতের জল ১৫ঃ১।

ডাইং প্রসেসে ব্যবহৃত ব্যাপক পরিমাণ পানি এবং রঙ ও কেমিক্যাল গুলো বড় সমস্যা হয়ে দাড়িয়েছে।বাংলাদেশ,ভারত,চীনের ডাইহাউজ গুলো স্থানীয় সরবরাহকৃত পানিকে নষ্ট করাই না, অপরিশোধিত বর্জ্য ফেলে নদী বা জলাশয়ের পানিকে দূষণ করার জন্য উল্লেখযোগ্য। এর প্রতিকার হিসেবে কি করা দরকার ?কারখানা গুলো অপ্রয়োজনীয় রঞ্জক থেকে জল ও জলের অনুপাত বিবেচনা করতে পারে।টেক্সটাইল রঞ্জক জড়িত সমস্যা সমাধানে উত্তর অঞ্চলের কারখানা যন্ত্রগুলোতে আছে।

বস্ত্র কারখানায় জলের মিশ্রণ :

কৃষির পড়ে বস্ত্র হল পানি দুষণের সবচেয়ে ভারী কারণ । অনুমান অনুমান করা যায় ২০৩০ সালের মধ্যে জনসংখ্যার সাথে বিশুদ্ধ পানির সংকট ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে এবং ২০৫০ সালের মধ্যে বিলিয়ন প্লাস জনবলের জীবন যাত্রার মূলক চাহিদা হবে বিশুদ্ধ জল । ১ কেজি কটন ফেব্রিক রঙ করতে ২৬ গ্যালন জল প্রয়োজন । গড়ে প্রতিদিন টেক্সটাইল মিলে ১.৬ মিলিয়ন লিটার পানি ব্যবহার হয় । প্রতি কেজি কাপড়ে রঙের ধরণের উপর নির্ভর করে ৩০-৫০ লিটার জল লাগে । প্রতিদিনের সুতা ও নকাপড়ে থেকে ১৫-২০% বর্জ্য পানি দূষণ করে।

ওয়াটারলেস টেক্সটাইল কাজ করা সংস্থা :-
১. কালারজেন : 

এই প্রক্রিয়ায় তুলার আণবিক কাঠামো সংশোধন করে এবং ফাইবারের রঙের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য ফিক্সিং এজেন্টের প্রয়োজনীয়তা কমায়। জলের প্রচুর প্রবাহ ছাড়াই ফাইবারের মধ্যে রঙ সরবরাহ করে । ব্যবহৃত প্রক্রিয়া গুলোর তুলনায় কালাজেন দাবি করেছেন ৯০ শতাংশ কম জল এবং ৭৫% কম শক্তি প্রয়োগ করে প্রসেস সম্পন্ন করতে পারে।

২. এয়ার ডাই :

এই নিয়মে সাধারণত বায়ু প্রবাহের মাধ্যমে পোশাকে রঙ করণ হয়। প্রথমে রঙ বা কালারকে পারমাণবিক ভাবে বিভক্ত করা হয়। তারপর উচ্চচাপের বায়ু প্রবাহের সাথে মিশিয়ে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে কাপড়কে উত্তপ্ত করে নজেলের মাধ্যমে কাপড়ের উপরিপৃষ্ঠে বায়ু সঞ্চালন করা হয় এবং আস্তে আস্তে কাপড়কে এগিয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে রঙ ফাইবারের উপরে না দিয়ে সরাসরি ফাইবারের ভিতরে প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হয়। সেই জন্য ব্লিচিং এজেন্ট জাতীয় পরিষ্কারক দ্রব্যাদির কোনো প্রভাব পড়ে না। ফলে রঙ টেকসই হয়। Air dyeing  প্রসেসের মাধ্যমে কটন,পলিয়েস্টার ,সিন্থেটিক ফাইবারও রঙ করা সম্ভব। এই পদ্ধতিতে ৯৫ শতাংশ জল এবং ৮৬ শতাংশ পর্যন্ত শক্তি সাশ্রয় হয়।

জানা যায় যে, একটি কোম্পানি এই পদ্ধতিতে ২৫০০০ পোশাক রঙ করলে আনুমানিক ১,১৩২,৫০০ শক্তি সাশ্রয় হবে । সেই সাথে প্রচুর পরিমান পানিও। যা পানি দূষন কমিয়ে আনতে সাহায্য করবে এবং টেকসই কালার নিশ্চিত করতে পারবে।

. অ্যাডিডাস : 

জলের বিকল্প অ্যাডিডাস সরবরাহকারী পলিয়েস্টার ফেব্রিকের মধ্যে রঙ ছড়িয়ে দেওয়ার এজেন্ট হিসাবে সংকুচিত এবং চাপ যুক্ত  কার্বন-ডাই অক্সাইড CO2 ব্যবহার করা হয়। কার্বন-ডাই অক্সাইড CO2 তরলের মতো বৈশিষ্ট্য যুক্ত স্টেইনলেস স্টিলের চেম্বার থাকে। রঙ করণের পরে কার্বন-ডাই অক্সাইড CO2 গ্যাসীয় অবস্থায় চলে যায় cotton fiber এর মধ্যে গ্যাস আলাদা হওয়ার সাথে রঙ মিশে যায়। পরব19র্তীতে  কার্বন-ডাই অক্সাইড CO2 পুনব্যবহার  যোগ্য করা হয়। কার্বন-ডাই অক্সাইড CO2 ব্যবহার করা নিরাপদ এবং eco-friendly এর অন্যতম কারণ। কোন ঝুকি ছাড়াই কার্বন-ডাই অক্সাইড CO2 বারবার ব্যবহার করা যেতে পারে।

. ডাইকু:

রঙের সাথে ফ্যাব্রিক infuse কমিয়ে দেওয়ার জন্য পানির চেয়ে সুপারক্রিটিক্যাল কার্বন ডাই অক্সাইড (CO2 ) গ্যাস ব্যবহার করে।  বিশেষ তাপমাত্রা-নিয়ন্ত্রিত চাপ  কার্বন ডাই অক্সাইডকে জলের মতো তরল হিসাবে চিহ্নিত করতে বাধ্য করে [সুপারক্রিটিক্যাল কার্বন ডাই অক্সাইড (CO2 ) ] যার ফলে পলিমার ফাইবার ফুলে যায় এবং পলিমারের মধ্যে সহজেই ছড়িয়ে যায়, ফাইবার গুলোর মধ্যে কার্বন- ডাই অক্সাইড  প্রবেশ করে এবং রঙ বহন করে  ফ্যাব্রিক মধ্যে।  

 ৫.ডাইকো Waterless dyeing : 

মার্চ ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ডাচ ভিত্তিক সংস্থা ডাইকু হ’ল বিশ্বের CO2 ডাইং element গুলোর চালনাকারী এবং CO2 ডাইং প্রযুক্তি এবং প্রসেসের উচ্চমানীয় আবিষ্কারক। এই প্রসেসে পানির ব্যবহার শূন্য। এই প্রক্রিয়ায় সুপারক্রিটিক্যাল co2 ব্যবহৃত হয়।সুপারক্রিটিক্যাল এমন একটা অবস্থা যেখানে পদার্থকে তরলে পরিণত করা যায় এবং উচ্চ চাপে গ্যাসীয় বা বায়বীয় পদার্থে রূপান্তরিত করা হয়। ধাতব পদার্থ এবং ডাইকো একটি পূর্ব উত্তপ্ত ভেসেলের ভিতরে দেওয়া হয়। তাপমাত্রা ৩১° সেলসিয়াস এবং চাপকে ৭৪ বার এর উপরে রেখে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

C:\Users\SAURAV KARMOKER\AppData\Local\Microsoft\Windows\INetCache\Content.Word\Untitled-2.png

এর ফলে CO2 সুপারক্রিটিক্যাল অবস্থাতে রূপ নেয়।এরপর সুপারক্রিটিক্যাল CO2 চলাচল করানোর মাধ্যমে সম্ভাব্য ৩০ মিনিট এর মধ্যে কাপড় রং করা হয়।ডাইং প্রক্রিয়ার সময় ১২০° সেলসিয়াস তাপমাত্রা এবং ২৫০ বার চাপ প্রদান করানো হয়। ফলে CO2 ফাইবারের ভেতর প্রবেশ করে সোয়েলিং এজেন্ট হিসাবে কাজ করতে সক্ষম হয় এবং রঙ ডিফিউজ হয়। CO2 সহজেই বায়োডিগ্রেডেবল এবং কোন রকম উদ্বায়ী যৌগ গুলোকে প্রকাশ করে না। CO2 এর বড় গুণ হলো এটিকে পুনরুদ্ধার করা যায় এবং পুনরুদ্ধার করণে CO2 কে ৯৫ শতাংশ কাজে লাগানো যায়। ডাইকো ওয়াটারলেস ডাইং টেকনোলজিতে উৎপাদন খরচ প্রায় ৫০ শতাংশ কমে আসে। এই পদ্ধতিতে সিন্থেটিক, পলিয়েস্টার রঙ করা সম্ভব। এই প্রক্রিয়ার দ্বারা বর্ণের সান্দ্রতা কম হয়। ফলে প্রচলিত ডাইং প্রসেসের তুলনায় জল কম লাগে,শক্তিও কম খরচ হয়। বর্জ্য কম অপসারণ হয় অর্থাৎ নেই বললেই চলে। এই প্রক্রিয়ায় প্রায় ২-৩ ঘন্টার মধ্যে রঙ করণ প্রক্রিয়া সম্ভব হয়।

এটি পরিবেশ বান্ধব এবং টেকসই প্রসেস।

নাইক ও ডাইকো :

২০১৩ সালে, নাইক, ইনক(Inc.) ডাইকুর সাথে কৌশলগত অংশীদারিত্বের মাধ্যমে ফ্যাব্রিক ডাইং থেকে জল এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহার দূরীকরণের জন্য উচ্চ প্রযুক্তির সরঞ্জামযুক্ত একটি   সু-ব্যবস্থা উদ্বোধন করে। যেতা হলো নাইক, ইনক(Inc.)। পরিবেশের সুবিধাগুলি এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে অর্জিত অভূতপূর্ব রঙিনকে তুলে ধরতে এই টেকসই উদ্ভাবনের নাম দিয়েছে “কালারড্রাই”।

রঙিন শুকনো প্রযুক্তি তরল  কার্বন-ডাই অক্সাইড CO2কে সুপারক্রিটিক্যাল ফ্লুইড কার্বন ডাই অক্সাইড বা “এসসিএফ” CO2তে রূপান্তর করার জন্য তাপ এবং চাপ ব্যবহার করে জলকে সরিয়ে দেয়, যা পরে ফ্যাব্রিকের মধ্যে ছোটাছুটি করে এবং ডাইগুলি বহন করে।

কালারড্রাই কেবল ফ্যাব্রিক ডাইং থেকে জল অপসারণ করে না, এটি  চিরাচরিত রঙের তুলনায় প্রায় ৬০% শক্তি প্রয়োগ কমিয়ে দেয়। প্রক্রিয়াজাত রাসায়নিক দ্রব্য গুলির ব্যবহারকে নির্মূল করে এবং প্রক্রিয়ায় প্রায় ১০০% রঙ ব্যবহার করে, বর্জ্য পানির দূষণের সম্ভাব্যতাকে অনেকাংশে সরিয়ে দেয়।

কার্বন ডাইঅক্সাইডের দ্বারা রঙ :

কার্বন ডাই অক্সাইড যখন ৩১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে উত্তাপিত হয় এবং ৭৪ বারের উপরে চাপ দেওয়া হয়, তখন এটি সুপারক্রিটিক্যাল হয়ে যায়, পদার্থের এমন একটি অবস্থা যা  তরল বা সংকোচিত গ্যাস হিসাবে দেখা যায়। কার্বন ডাই অক্সাইডে তরল এবং গ্যাস উভয়েরই বৈশিষ্ট্য রয়েছে।  এইভাবে সুপারক্রিটিকাল কার্বন ডাই অক্সাইডে তরলের মতো ঘনত্ব রয়েছে, যা হাইড্রোফোবিক বর্ণগুলি দ্রবীভূত করার পক্ষে উপকারী এবং গ্যাসের মতো কম সান্দ্রতা এবং ছড়িয়ে পড়া বৈশিষ্ট্য, যা পানির তুলনায় রাইজিং এর সময়কে আরও  কম করে  দেয়।  এই জাতীয় বৈশিষ্ট্যগুলির সাথে, তাদের ন্যূনতম পৃষ্ঠের টান রয়েছে যা উপকরণগুলিতে আরও ভাল  কাজ করে

রংকরণ  প্রক্রিয়া চলাকালীন, কার্বন-ডাই অক্সাইড (CO2) ১২০ডিগ্রি সেলসিয়াসে উত্তপ্ত হয় এবং ২৫০ বারে চাপ দেওয়া হয়।  এর প্রসারিত তরল অবস্থায় কার্বন-ডাই অক্সাইড (CO2)  টেক্সটাইল ফাইবারগুলোতে  প্রবেশ করে এবং প্রক্রিয়া চলাকালীন সময়ে সোয়েলিং এজেন্ট হিসাবে কাজ করে, যা ফাইবারে রঙ ছড়িয়ে দেয়। ফাইবার গুলোর গ্লাস-ট্রানজিশন তাপমাত্রা কম করা হয়, যা টেক্সটাইল ফাইবারের ভিতরে  প্রবেশের হারকে বৃদ্ধি করে। ফাইবারগুলতে  রঙ ঠিক করার জন্য,  কার্বন-ডাই অক্সাইড (CO2)  ডাইস্টফ দিয়ে পূর্ণ করা হয় যা ফাইবারের এবং কৈশিক কাঠামোর গভীরে প্রবেশ করে, এই হাইড্রোফোবিক পদার্থগুলির কার্য সরবরাহ করে।  

Sustainably টেক্সটাইল ডাইং এর  আবিষ্কৃত কয়েকটি টেকসই ডাইং প্রসেস:

সুপার ক্রিটিক্যাল কার্বন-ডাই অক্সাইড COছাড়াও  পরিবেশের জন্য উপযোগী এবং টেকসই কিছু ডাইং প্রক্রিয়া আছে। বর্তমানে টেক্সটাইল ডাইং ইন্ডাস্ট্রিগুলো হ্যালোজেন এবং ভারী ধাতু মুক্ত , খুব উচ্চ নিষ্কাশন এবং স্থিরকরণ মান সম্পন্ন রঞ্জক পদার্থ ব্যবহারের  জন্য সোচ্চার। কয়েকটি নতুন   আবিষ্কৃত  ডাইং পদ্ধতি নিচে  পর্যালোচনা করা হল :

প্রাকৃতিক  পিগমেন্ট এর ব্যবহার :

ন্যাচারাল ডাইস অথবা প্রাকৃতিক রঞ্জক উপাদানগুলো  পরিবেশবান্ধব  । প্রাকৃতিক রঞ্জক এন্টি-ব্যাকটেরিয়াল   এবং এন্টি-ফাংগাল   গুণসম্পন্ন হয়ে থাকে। এজন্য প্রাকৃতিক রঞ্জকের মাধ্যমে ডাইং করা পোশাকে ব্যাকটেরিয়া এবং ছত্রাক এর আক্রমণ কম হয় যা পোশাক পরিধানকারীকে বিভিন্ন রোগের হাত থেকে রক্ষা করে। প্রাকৃতিক রঞ্জক উপাদানগুলো সাধারনত উদ্ভিদ (ফল, ছাল, কান্ড)  , খনিজ , ব্যাকটেরিয়া , ছত্রাক , সামুদ্রিক প্রাণী   ব্যবহারের মাধ্যমে তৈরি করা হয় এবং এটা সিন্থেটিক বা কৃত্রিম রঞ্জক উপাদানের বিকল্প এবং  ভেষজ  গুণাগুণ  সম্পন্ন হয়ে থাকে। বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের ফল থেকে রঙ তৈরীর আবিষ্কার করছে।    তরমুজের নির্যাস থেকে কটন ফেব্রিকের কালারেশন পদ্ধতি সফলতা পেয়েছে। এটা একটা পরিবেশবান্ধব কটন্ কালারেশন পদ্ধতি।এই পদ্ধতিতে তুলনামুলকভাবে কম শক্তি খরচ হয় এবং কম কেমিক্যাল   ব্যবহারের প্রয়োজন পরে। এভাবে ন্যাচারাল ডাইং এর ব্যবহার   পদ্ধতি বিকাশের দিকে টেক্সটাইল ডাইং ইন্ডাস্ট্রির গতি ত্বরান্বিত  করতে পারে এবং এই পদ্ধতি শুধু বায়ো-ডিগ্রেডেবলই নয় পাশাপাশি এন্টি-ব্যাক্টেরিয়াল , এন্টি-ইনফ্লেমেটারি এবং এন্টি-অ্যালার্জিক কাপড় তৈরিতে সাহায্য করে।

C:\Users\SAURAV KARMOKER\Desktop\Untitled-6.png

টেক্সটাইল ফাইবার থেকে উৎপন্ন পাউডার ডাইসের ব্যবহার :

ইতালির  একটি কোম্পানি   টেকসই ডাইং এর একটা নতুন আবিষ্কার নিয়ে এসেছে এবং সেটি হচ্ছে টেকসই রঞ্জক রেঞ্জ (রেসিক্রোম) যা তৈরি করা হয়েছে টেক্সটাইল স্ক্র্যাপ, ফাইবার উপাদান এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য পোশাক থেকে। বেশিরভাগ রঞ্জকই রাসায়নিক দ্রবণ হিসাবে প্রয়োগ করা হলেও রেসিক্রোম কে সাস্পেনশন (suspension) হিসাবে প্রয়োগ করা হয়। এতে করে পানির ফিল্ট্রেশন  সহজ হয় এবং পরিবেশগত প্রভাব কমে যায় ।

কটনপ্রি-ট্রিটমেন্ট : কটন প্রি-ট্রিটমেন্টের জন্য প্রায় ২০০ লিটারের মতন পানি এর প্রয়োজন হয় ১ কেজি ফেব্রিক ডাইং করার জন্য। একারণে নতুন একটা কটন প্রি-ট্রিটমেন্ট পদ্ধতি আবিষ্কার হয়েছে যেখানে কটন কে ইকোফাস্ট পিওর   নামক ক্যাটায়নিক রিএজেন্ট দ্বারা প্রি-ট্রিটমেন্ট করা হয়। এই আবিষ্কৃত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কটন ডাইং প্রসেসে ব্যবহৃত পানির পরিমাণ ৫০ শতাংশের মতো কমানো যায়। ইকোফাস্ট পিওর দিয়ে প্রি-ট্রিটেড কটনের রঞ্জক ধরে রাখার ক্ষমতা বেশি এবং রঞ্জক ধরে রাখার জন্য কোন রকম ফিক্সেশন কেমিক্যাল এর প্রয়োজন হয়  না। এইভাবে ৯৫ শতাংশের মতো বিষাক্ত কেমিক্যালের ব্যবহার কমানো সম্ভব বলে ধারণা করা যায়। 

অসুবিধা /চ্যালেঞ্জ : ডাইং প্রসেস এবং মেশিনের সম্পর্কিত কিছু অসুবিধা রয়েছে।
ডাইং প্রসেসে ২৬০-২৮০ বার চাপ এবং ১৩০°সেলসিয়াস তাপমাত্রা প্রয়োগ করা হয়। এই তাপ ও চাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে  হবে এবং করণীয় বিষয়বস্তুর জন্য পর্যাপ্ত ইনভেস্টমেন্ট দরকার। তা না হলে অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। 

শিল্প ও শ্রম সুরক্ষার জন্য বাতাসে কার্বন-ডাই অক্সাইড CO2  এর ঘনত্ব পরিমাপের মিটার রাখতে হবে। রঙ গুলো শুকনো হওয়ার জন্য ক্লাসিকাল রঙ পরিমাপটি এই বিষয়ে নতুন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হবে। মেশিনটি প্রাকৃতিক (হাইড্রোফিলিক) ফাইবার গুলো রঙ করার জন্য উপযোগী নয়।কারণ সুপারক্রিটিক্যাল  CO2 এর প্রসারণ H- বন্ড গুলো ভাঙতে অক্ষম।  প্রতিক্রিয়াশীল রঙ,এসিড বর্ণ গুলো  বেশি তাপ ও চাপে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তাছাড়া এই মেশিনের মূল্য একটি বড় বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। প্রত্যক ডাইং হাউজ এবং ছোট ছোট ফ্যাক্টরির জন্য বিশাল মূল্যের জিনিস কেনা গোদের উপর বিষ ফোড়ার মতো। তাই একটা লিমিটের ভিতর মূল্য হলে বিভিন্ন ডাইং হাউজ এবং ছোট ছোট ফ্যাক্টরি গুলোতে মেশিন বসানো সম্ভব হবে।বলাই বাহুল্য যে যদিও ওয়াটারলেস ডাইং টেকনোলজি পরিবেশবান্ধব এবং অনেকটা সাশ্রয়ী কিন্তু তাও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত মেশিন গুলোর দাম নরমাল ডাইং মেশিন এর তুলনায় অনেক বেশি। DyeCoo এর একেকটি মেশিনের দাম প্রায় ২৫ লক্ষ থেকে ৪০ লক্ষ ডলার পর্যন্ত হতে পারে। যা বাংলাদেশি টাকাতে প্রায় একুশ কোটি পচিশ লাখ (২১২৫০০০০০) টাকা। এই রকম  ধরনের বড়  খরচ  অধিকাংশ  সব কোম্পানির পক্ষে বহন করা সম্ভব না। Nike এবং Adidas dyeCoo কম্পানির এই  মেশিন ব্যবহার করে থাকে। এছাড়াও মূলত সিনথেটিক ফাইবার গুলোই ওয়াটারলেস ডাইং সম্ভব, কটনের  স্বল্প আকারে এই  টেকনোলজি ব্যবহার করা সম্ভব তাও তার কিছু প্রতিবন্ধকতা থেকে যায়। বর্তমানে এর উপর গবেষণা চলছে কিভাবে এই টেকনোলজিকে  প্রাকৃতিক  ফাইবারের ডাই উপযোগী করে তোলা সম্ভব।    

উপসংহার :

রাঙাও পৃথিবী নতুন রঙে 
বিশাল পাঠ্যশালায়-
ঘুচে যাক সব আঁধার 
রঙের উজ্জ্বল আলোয়।

বস্ত্র শিল্পে নতুন আবিষ্কার নতুন স্বপ্নের জোয়ার এনে দেয়। কৃষির পর পানি দূষণের জন্য দায়ী ডাইং প্রসেস। ডাইং প্রসেসে পানির ব্যাপক অপচয় এবং অতিমাত্রায় পানি দূষণের জন্য একমাত্র দায়ী রাসায়নিক যৌগ গুলো। বিশ্বব্যাংকের মতে, ১৭-২০% জল দূষিত হওয়ার উৎস হল টেক্সটাইল ডাইং ব্যবস্থা।কারণ টেক্সটাইলের ব্যবহৃত  ট্রিলিয়ন  গ্যালন জল কাপড় রং করার জন্য ব্যবহৃত হয় যার সিংহ ভাগই কোন রকম রিফাইন প্রক্রিয়া ছাড়াই প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে নদীর জল দূষিত ও বিষাক্ততার রূপ নিয়েছে। সেই সাথে জলের স্তর কমতে শুরু করেছে। ডাইকু দাবি করেন যে ২০১৮ সালের মোট টেক্সটাইল বাজারের পরিমাণ ছিলো যথার্থ। ৯৬ মিলিয়ন টন যার মধ্যে ৫০ মিলিয়ন টন পলিয়েস্টারের জন্য এবং এই চাহিদার পরিমান এখনো বেড়েই চলেছে। ডাইকুর কার্বন-ডাই অক্সাইড (CO2)  রঙ করণ প্রযুক্তি এখন প্রমাণিত এবং বিশ্বে এই ব্যবস্থা ছরড়িয়ে দিতে সক্ষম । থাইল্যান্ড ,তাইওয়ান,ভিয়েতনামর একাধিক গ্রাহক রয়েছে যার প্রতি বছর ৭ মিলিয়ন এর বেশি পলিয়েস্টার উৎপাদনে সক্ষম হবে।

পানি দূষন কমাতে এবং এই দূষণ সমস্যা সমাধান করতে ডাইকো এর মতো উদ্ভাবনী ব্যবস্থা অপরহার্য। সেই সাথে প্রাকৃতিক উপায়গুলো ডাইং প্রসেসে ব্যবহার করলে পানি দূষণের মাত্রা কমা ছাড়াও  পরিবেশের ভারসাম্য এবং  মানুষের  অসুস্থতার হার কমে যাবে। 

রেফারেন্স : 
১. Fiber2Fashion.com
২. Dyecoo.com
৩. Bunon.Info
৪. Blog.airdye৫. Indiantextilejournal.com

সিদ্ধার্থ শুভ রায় Research Assistant, বুনন
Bangladesh Handloom Education & Training Institute (BHETI)

 

Most Popular

এওপিটিবি’র মিলনমেলা

সমগ্র বাংলাদেশের অল ওভার প্রিন্টিং সেক্টর নিয়ে কাজ করা সকল ইঞ্জিনিয়ার ও টেকনোলজিস্টদের প্রাণের সংগঠন “অল ওভার প্রিন্টিং টেকনোলজিস্টস অব বাংলাদেশ”।সংগঠনটির...

ভিয়েতনামের বিকল্প খুজঁছে বিশ্বের বিভিন্ন খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান

সাধারনত যে সকল খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো জুতা ও পোশাকের জন্য ভিয়েতনামের কারখানাগুলোর ওপর নির্ভরশীল তারা ভিয়েতনামের বিধিনিষেধের ব্যাপারে খুবই চিন্তিত। যদিও...

অনাবিল প্রশান্তির মনোরম পরিবেশে গড়ে উঠেছে ফতুল্লা এপারেল

তৈরী পোশাক শিল্প বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার। দেশের মোট রফতানি আয়ের  ৮৪% আসে পোশাক খাত থেকে। তাই দিন দিন দেশে...

রপ্তানিতে ভিয়েতনামকে ছাড়িয়ে যাওয়ার জন্য বাণিজ্য নীতির সংস্কারের বিকল্প নেই : বিশেষজ্ঞরা

ব্যাপক বাণিজ্য কূটনীতির সংস্কার এবং অর্থনৈতিক নীতির উন্মুক্ততা ভিয়েতনামকে আজ সেরা ২০ টি দেশের তালিকায় আসতে সাহায্য করেছে। উদাহরনসরূপ ১৯৮০-৯০ সালের...

শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুতে স্বাশিপ এর শোক প্রকাশ এবং আত্মার মাগফিরাত কামনা

বাংলাদেশে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিম, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শেখ মো. আব্দুল্লাহ (৭৪) এবং সিলেট...

PDASKTEC -এর শুভ উদ্বোধনী

টিকা আবিষ্কারের মাধ্যমে  করোনা মহামারীর ভয় কিছুটা কমে আসলেও এখনও সচল হয়ে ওঠেনি দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলো।তবুও এই বিশ্বব্যাপী মহামারীতে পিছিয়ে...

শাড়ির উৎপত্তি এবং ইতিহাস | The origin & history of Saree

শাড়ি পরতে পছন্দ করেনা এমন নারী পাওয়া যাবেনা। আর কোনো অনুষ্ঠান হলেতো মেয়েদের পছন্দের তালিকায় আজকাল জায়গা করে নেয় নানা নামের...